বিয়ের শোভাযাত্রা থেকে লাশের মিছিল, স্ত্রী-সন্তানসহ ৯ স্বজন হারিয়ে স্তব্ধ জনি
- আপডেট সময় : ০১:৩৩:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
চোখের সামনে স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ জনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আশরাফুল রহমান জনি। আনন্দের বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে যে যাত্রা ছিল ঘরে ফেরার, সেটিই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয়েছে লাশের মিছিলে। বেঁচে থাকলেও যেন সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন তিনি।
জনির ছোট ভাই সাব্বিরের বিয়েতে খুলনার কয়রায় গিয়েছিলেন তারা। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের সদস্যরা একটি মাইক্রোবাসে করে ফিরছিলেন। তবে জনি মাইক্রোবাসে না উঠে মোটরসাইকেলে করে গাড়িটির পেছন পেছন আসছিলেন। সেই সিদ্ধান্তই তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে তার জীবনের সবকিছু।
পথিমধ্যে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই মৃত্যু ঘটে মাইক্রোবাসে থাকা একের পর এক স্বজনের। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে যান জনি।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন, জনির স্ত্রী ফারজানা সিদ্দিকা পুতুল, তাদের তিন সন্তান আবু তালহা আলিফ, ইরাম ও রায়হানা রহমান। শুধু তাই নয়, গাড়ির ভেতর থেকে বের করা হয় জনির বাবা, ভাই, বোন এবং ভাগ্নে-ভাগ্নির মরদেহও।
একসঙ্গে এতগুলো প্রিয় মানুষকে হারানোর সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারেননি তিনি। ঘটনার পর থেকে প্রায় নির্বাক হয়ে পড়েছেন জনি।
স্বজনরা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে জনি প্রায় কোনো কথাই বলছেন না। তিনি শুধু নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, মাঝে মাঝে ধীরে ধীরে চোখ তুলে চারপাশে তাকান। যেন বুঝতেই পারছেন না কী ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যে পড়ে গেছেন।

জনির মামা নেসারুল ইসলাম সবুজ বলেন, আমার ভাগ্নে জনির স্ত্রীসহ তিন সন্তান মারা গেছে। তার বাবা, ভাই, বোন ও তাদের সন্তানসহ মোট ৯ জনকে হারিয়েছে সে। দুর্ঘটনার পর থেকে জনি আর কোনো কথা বলছে না। শুধু চুপ করে বসে থাকে, মাঝে মাঝে তাকায়। মনে হয় সে যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন, বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী এবং তার ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম।
এছাড়া জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল ও তাদের সন্তানরা, কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম, নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈমও নিহত হয়েছেন।
এদিকে পরিবারের সদস্যদের এমন মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন জনির মা আঞ্জুমানয়ারা। বৃহস্পতিবার থেকেই তিনি প্রায় অসাড় হয়ে রয়েছেন। আর বেঁচে থাকা আরেক ভাই সাদ্দাম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
এ ঘটনায় পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে মোংলার আকাশ। স্থানীয়দের ভাষায়, বিয়ের আনন্দ যে এভাবে মুহূর্তেই গভীর শোকে পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এর আগে তারা দেখেননি।
একটি পরিবারের সুখের দিনে শুরু হওয়া পথচলা শেষ হয়েছে অসংখ্য স্বপ্নভঙ্গ আর অশেষ শোকে। আর সেই শোকের ভার নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছেন জনি-যেন জীবনের সব শব্দ হারিয়ে ফেলেছেন।

















