ফরাসি সিনেমার আইকন ব্রিজিত বার্দোর চিরবিদায়
- আপডেট সময় : ০৭:৩৬:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ৬৯ বার পড়া হয়েছে
ফরাসি চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দা আজ আরও একবার নিঃশব্দ। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য নাম, এক বিস্ফোরক উপস্থিতি-ব্রিজিত বার্দো আর নেই। ফরাসি সিনেমার এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী রোববার ৯১ বছর বয়সে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নেন। তাঁর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।
১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উইম্যান’ সিনেমার সেই খালি পায়ে মাম্বো নাচ, এই একটি দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল সিনেমার ইতিহাস বদলে দিতে। এলোমেলো চুল, বিদ্রোহী দৃষ্টি আর দুর্দমনীয় শরীরী ভাষায় বার্দো পর্দায় এনে দেন এমন এক যৌন আবেদন, যা তৎকালীন মূলধারার সিনেমায় ছিল অকল্পনীয়। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি সেন্সরশিপের চোখে চোখ রেখে হয়ে ওঠেন এক বৈশ্বিক আইকন।

ফ্রান্সে তিনি পরিচিত ছিলেন শুধু দুই অক্ষরে ‘বি.বি.’। কিন্তু এই নামের ভেতর লুকিয়ে ছিল স্বাধীনতা, সাহস আর সামাজিক প্রচলনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি। বার্দোর নারী চরিত্র ছিল নিয়ন্ত্রণহীন, আত্মনির্ভর ও স্বতঃস্ফূর্ত যা ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের সংযত নারীচিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্ম নেওয়া বার্দো বড় হন উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে। লাজুক স্বভাবের এই কিশোরী ১৫ বছর বয়সেই এল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নেন। সেখান থেকেই মডেলিং হয়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ। খুব দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক প্রতীক। তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, বলা হয়, বব ডিলান তার প্রথম গান লিখেছিলেন বার্দোকে নিয়ে, অ্যান্ডি ওয়ারহল এঁকেছিলেন তার প্রতিকৃতি।

নারীবাদী দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার ১৯৫৯ সালে লিখেছিলেন, “বার্দো কেলেঙ্কারি ঘটান না, তিনি সহজাত প্রবৃত্তির টানেই বাঁচেন।” এই স্বতঃস্ফূর্ততাই তাকে ‘সেক্স সিম্বল’ ছাড়িয়ে পপ সংস্কৃতির এক পরশ পাথরে পরিণত করে।
তবে খ্যাতির এই ঝলকানি জীবনে এনে দেয় গভীর একাকিত্বও। বার্দো নিজেই বলেছিলেন, খ্যাতির ভেতর তিনি বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। চারটি বিয়ে, অসংখ্য প্রেম আর বিষণ্নতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। “আমি খুব বিখ্যাত ছিলাম, কিন্তু খুব অসুখীও,”—স্বীকার করেছিলেন বার্দো।
১৯৭৩ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে অভিনয়কে বিদায় জানান তিনি। এরপর নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেন প্রাণী অধিকার আন্দোলনে। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন। সাঁ-ত্রোপেতে নিভৃত জীবনে ঘেরা থাকতেন বিড়াল, কুকুর আর ঘোড়ায়। একবার বলেছিলেন, “আমার সৌন্দর্য পুরুষদের দিয়েছি, এখন আমার প্রজ্ঞা দেব প্রাণীদের।

তবে তার জীবন ছিল বিতর্কহীন নয়। অভিবাসন, ইসলাম ও রাজনীতি নিয়ে কট্টর ডানপন্থী অবস্থানের কারণে একাধিকবার আইনি শাস্তির মুখে পড়েন। তবুও এসব বিতর্ক ছাপিয়ে বার্দো রয়ে গেছেন সিনেমার ইতিহাসে এক অমর নাম।
আজ ব্রিজিত বার্দোর মৃত্যুতে পর্দা নামলেও, বিদ্রোহী নারীর যে ছায়া তিনি রেখে গেছেন, তা চিরকাল আলো জ্বালিয়ে রাখবে ফরাসি সিনেমার আকাশে।



















