নির্বাচন সামনে রেখে লুটের অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে শঙ্কা, নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ০৩:১১:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশের থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি। এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই লাখেরও বেশি গোলাবারুদের কোনো হদিস না থাকায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার পর দেশজুড়ে নজিরবিহীন সহিংসতা দেখা দেয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চার শতাধিক থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সে সময় হামলাকারীরা হাজার হাজার আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ নিয়ে যায় বলে পুলিশের প্রাথমিক হিসাব ছিল। পরবর্তীতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬১৯টি এবং গোলাবারুদ ছিল চার লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড।
এই অস্ত্র উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সেনা ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী বিশেষ অভিযান শুরু করে। দেড় বছরে প্রায় ২ হাজার ২৫৯টি অস্ত্র এবং দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হলেও এখনও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অস্ত্র এবং প্রায় অর্ধেক গোলাবারুদ নিখোঁজ রয়েছে। অবশিষ্ট অস্ত্র উদ্ধারে সরকার পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করলেও প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যর্থতা নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রার ঝুঁকি যোগ করেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এতদিনে পুরোপুরি উদ্ধার হওয়া উচিত ছিল। ভোটের আগে এগুলো উদ্ধার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এই শঙ্কা শুধু সম্ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত দেড় বছরে লুটের অস্ত্র ব্যবহারের একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। খুলনা, চট্টগ্রাম ও মুন্সিগঞ্জে ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং হত্যাকাণ্ডে পুলিশের লুট হওয়া পিস্তল ও শটগান ব্যবহারের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে এক নারী হত্যাকাণ্ডে ওয়ারী থানা থেকে লুট হওয়া পিস্তল ব্যবহারের বিষয়টি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, খোয়া যাওয়া অস্ত্র কার হাতে আছে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
এ অবস্থায় পুলিশের দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় পুলিশ কার্যত মাঠছাড়া ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাহিনীকে পুনরায় সক্রিয় করা হলেও আস্থা সংকট পুরোপুরি কাটেনি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাহিনীর মনোবল, শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতায় এখনও ঘাটতি রয়েছে।
এর মধ্যেই নির্বাচন সামনে রেখে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে গোলাগুলিতে অন্তত ২২ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, ভোটের সময় যদি মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে না করে, তাহলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, কীভাবে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রেখে নিরাপদ নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। নিবন্ধিত ৫৯টি দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় অংশ নিতে পারছে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ থাকায় নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকার বলছে, নির্বাচন নিরাপদ রাখতে সেনা, পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর প্রায় নয় লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দাবি করেছেন, লুটের অস্ত্র নির্বাচনকালে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন যে অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলোর ব্যবহার কীভাবে পুরোপুরি ঠেকানো হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন নিরাপদ করতে কেবল বাহিনী মোতায়েন নয়, গোয়েন্দা নজরদারি, অস্ত্র ব্যবহারের কঠোর দমন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং ভোটারদের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লুটের অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে, এবং সেটিই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা পরীক্ষা। বিবিসি



















