দুর্যোগকবলিত উপকূল সুরক্ষায় জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি
- আপডেট সময় : ০১:০৪:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। শুক্রবার (১৯ জুন) অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচির আয়োজন করে ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডিআরডিএফ) এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের মাত্রা বাড়তে থাকায় উপকূলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের বিকল্প নেই বলে তারা মন্তব্য করেন।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে, পাশাপাশি লবণাক্ততার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সুপেয় পানির সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কিন্তু জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে উপকূলের সংকটকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
সমাবেশে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিআরডিএফের সভাপতি এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, উপকূলের সংকট এখন শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জেলে, কৃষক, মৎস্যসম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি সাগরে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বোট নিবন্ধন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, উন্নত আবহাওয়া সতর্কবার্তা, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম এবং মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় জনগণের জীবন-জীবিকা রক্ষায় জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান।

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রকল্প নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক প্রত্যন্ত এলাকা এখনও উন্নয়নের বাইরে রয়ে গেছে। তিনি বাজেট পাসের আগেই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে উপকূল রক্ষায় ২১ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-দেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা।
পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) গড়ে তোলা। টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার। প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংস্কার করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব করা। উপকূলীয় জনগণের জীবন-জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ।
এছাড়া দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ‘অবৈধ জাল বন্ধ কর, মৎস্যসম্পদ রক্ষা কর’ শীর্ষক সামাজিক আন্দোলনকে সফল করার আহ্বানও জানানো হয়।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষক নেতা আকমল হোসেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-এর সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী-এর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সচেতন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাকিলা পারভীন, ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম-এর প্রতিনিধি শাকিল আহমেদ এবং ইয়ুথ ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম-এর আহ্বায়ক সাদিয়া সুলতানা শাপলা।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, যা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য উৎপাদন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই জাতীয় বাজেটে উপকূলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।



















