জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভর্তুকি কমিয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের পরামর্শ আইএমএফের
- আপডেট সময় : ০৫:১৪:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকর রাজস্ব পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের (কিউএসএনসিসি) এলজি-০৩ হলে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরে আইএমএফের এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক বিভাগ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিভাগটির পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন, ডেপুটি ডিরেক্টর সোনালি জেইন চান্দ্রা এবং আইএমএফের কমিউনিকেশন অফিসার পাভিস দেবাস্বাদি। সোমবার (১২ অক্টোবর) শুরু হওয়া এ সম্মেলন চলবে আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত।
জ্বালানি সংকট ও প্রযুক্তির প্রভাব এশিয়ার অর্থনীতিতে
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এগুলো হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার ধারাবাহিক পুনর্গঠন।
তাদের মতে, এ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলের অর্থনীতি বিভিন্ন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে এর সুফল সব দেশ ও অর্থনীতির খাতে সমানভাবে পৌঁছায়নি। একই দেশের মধ্যেও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট খাতগুলো অন্যান্য খাতের তুলনায় বেশি সুবিধা পাচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনীতির এই সহনশীলতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা আগামী দিনে আরও বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
বক্তারা জানান, বড় অর্থনীতিগুলো মজুত জ্বালানি ব্যবহার, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমে তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তাও ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, বহু নিম্ন আয়ের দেশ, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দেশে জ্বালানি, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও সারের উচ্চমূল্য জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির প্রসার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। সেমিকন্ডাক্টর, এআই অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় রপ্তানি ও বিনিয়োগেও গতি এসেছে। তবে এআই খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো অনিশ্চিত।
২০২৬ সালে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৮ শতাংশ হতে পারে
আইএমএফের এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এ অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে দেশভেদে প্রবৃদ্ধির চিত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করছে আইএমএফ। যদিও এ হার সংস্থাটির এপ্রিলে দেওয়া ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন জানান, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সুবিধা পাওয়া অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানের কয়েকটি দেশ, চীন, ভারত ও জাপান।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির এই অগ্রগতি থেকে তুলনামূলকভাবে কম সুবিধা পাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। এ তালিকায় বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও এআই বিনিয়োগে ঝুঁকির আশঙ্কা
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির উচ্চমূল্য বজায় থাকতে পারে। পাশাপাশি এআই খাতে বিনিয়োগে বড় ধরনের পরিবর্তন কিংবা সংশ্লিষ্ট সম্পদের মূল্যায়নে সংশোধন হলে এশিয়ার অর্থনীতিতে অসমানুপাতিক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে গেলে তার প্রভাব এশিয়ার বন্ডবাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া তীব্র ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি দেখা দিলে কৃষি, মৎস্য ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
তবে এআই প্রযুক্তির কারণে উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়লে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক একীভূতকরণ গভীর হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতির পরামর্শ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে মূল্যস্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। তার মতে, যেসব দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
রাজস্বনীতির ক্ষেত্রে দুর্বল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এ ছাড়া বাজার ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বিষয়ে আর্থিক খাতের তদারককারী সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এবং আরও সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারা গড়ে তুলতে কয়েকটি ক্ষেত্রে সংস্কার ও বিনিয়োগ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমবাজার সংস্কার, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, সেবা খাতে বাণিজ্যিক একীভূতকরণ বৃদ্ধি, ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা।
তার মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।













