জৈব সার : মাটির প্রাণ বাঁচাতে ও বিষমুক্ত ফসলের স্বপ্নে নিবেদিত প্রকৃতিবন্ধু উজ্জ্বল কুন্ডু
- আপডেট সময় : ০৭:৪৩:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
চোখে-মুখে তার নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সিরাজগঞ্জের উদ্যোক্তা উজ্জ্বল কুন্ডু। জৈব পদ্ধতিতে কৃষিকে এগিয়ে নিতে তার প্রচেষ্টা যেন এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, সে দিন আর বেশি দূরে নয়, বাংলাদেশে জৈব সারের ব্যবহার আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিতে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। তার এই স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়।
উজ্জ্বল কুন্ডুর প্রত্যাশা, বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের খাদ্য হবে নিরাপদ, কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশও থাকবে সুরক্ষিত। তার মতো উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই দেশে গড়ে উঠতে পারে একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির উর্বরতা, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সামনে এসেছেন সিরাজগঞ্জের কৃষক উজ্জ্বল কুন্ডু।

মাটির প্রাণ ফিরিয়ে আনা এবং বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি গত চার বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
উজ্জ্বল কুন্ডুর বিশ্বাস, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) ও জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমেই নিরাপদ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আইপিএম পদ্ধতি মূলত এমন একটি বৈজ্ঞানিক কৃষি কৌশল, যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয়ে পোকামাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায়, ফলে মাটি, পানি ও বাতাস দূষণমুক্ত থাকে।
উজ্জল বাবু জানান, আইপিএম পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সুস্থ ফসল উৎপাদন, কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা। এতে উৎপাদন খরচও কমে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়।
উজ্জ্বল কুন্ডু তার নিজস্ব উদ্যোগে জৈব সার উৎপাদন করে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। গবাদিপশুর গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে তিনি উন্নতমানের জৈব সার তৈরি করেন।

এই সার ব্যবহারে মাটির জৈব গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়, মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে। উজ্জল বাবুর এই কাজের সহায়তা করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তান উৎসব কুন্ডু।
শুরুটা সহজ ছিল না। স্থানীয় অনেক কৃষক প্রথমদিকে তার পদ্ধতি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ, তারা দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল কুন্ডুর খামারে উৎপাদিত জৈব সারের গুণগত মান ও তার ব্যবহারে ভালো ফলন দেখে অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
বর্তমানে তার দেখানো পথে অনুপ্রাণিত হয়ে আশপাশের বেশ কয়েকজন কৃষক জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন।
উজ্জ্বল কুন্ডু মনে করেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন শুধু কৃষকের লাভের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। আমরা যা খাই, সেটাই আমাদের শরীরে যায়। যদি খাবারে বিষ থাকে, তাহলে তা আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। তাই বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন এখন সময়ের দাবি, বলেছেন তিনি।

তার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অনেক কৃষি কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিক তার কাজকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের কৃষিতে টেকসই পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতে উজ্জ্বল কুন্ডু তার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি চান, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে জৈব সার ও আইপিএম পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি পাক।
তার স্বপ্ন, একটি বিষমুক্ত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা, যেখানে মাটি থাকবে উর্বর, ফসল হবে স্বাস্থ্যসম্মত এবং মানুষ পাবে নিরাপদ খাদ্য।
উজ্জ্বল কুন্ডুর মতো কৃষিখাতের উদ্যোক্তা প্রমাণ করছেন, সচেতনতা ও উদ্যোগ থাকলে কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। মাটির প্রাণ বাঁচাতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে তার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।













