গোপন প্রেম, আলোঝলমলে জীবন আর করুণ সমাপ্তি-এই তিন শব্দেই যেন ধরা পড়ে John F. Kennedy Jr. ও Carolyn Bessette-Kennedy–এর গল্প। ক্ষমতা ও খ্যাতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও ব্যক্তিগত ভালোবাসা রক্ষার যে লড়াই, সেটিই আজও তাঁদের কাহিনিকে করে তুলেছে অনিবার্যভাবে আকর্ষণীয়।
নির্মাতা Ryan Murphy সত্য ঘটনা অবলম্বনে নাটকীয় উপস্থাপনায় সিদ্ধহস্ত। তাঁর প্রযোজনায় এফএক্সের নতুন সিরিজ Love Story: John F. Kennedy Jr. and Carolyn Bessette যেন এক আধুনিক রূপকথার দরজা খুলে দেয়, যার শুরুতেই আছে ট্র্যাজেডির ছায়া।
১৯৯৯ সালের সেই অন্ধকার আকাশ। একটি ছোট পাইপার সারাটোগা বিমান উড়ছে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে। ককপিটে কেনেডি জুনিয়র, পাশে তাঁর স্ত্রী ক্যারোলিন। গন্তব্য মার্থাস ভিনইয়ার্ড-কিন্তু নিয়তি লিখে রেখেছিল অন্য পরিণতি। কয়েক সেকেন্ডের বিভ্রান্তি, দ্রুত নেমে আসা উচ্চতা, আর তারপর সমুদ্রের গহ্বর। প্রেমের গল্পটি সেখানেই থেমে যায়, কিন্তু কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে থাকে।
গল্পের শুরু অবশ্য আরও আগে ১৯৯২ সালে। তখন ক্যারোলিন কাজ করতেন Calvin Klein–এর পাবলিসিস্ট হিসেবে। স্বাভাবিক সৌন্দর্য, নিরাবরণ স্টাইল আর নীরব ব্যক্তিত্ব তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। অন্যদিকে, কেনেডি জুনিয়র তখনো বহন করছেন তাঁর পিতার নামের ভার, John F. Kennedy–এর উত্তরাধিকার। ‘আমেরিকার রাজপুত্র’ বলে পরিচিত হলেও কর্মজীবনে তিনি তখন খানিক অনিশ্চয়তায়।

প্রথম দেখা এক পার্টিতে। প্রেম তখনই নয়, বরং ধীরে ধীরে। মাঝখানে ছিল অভিনেত্রী Daryl Hannah–এর সঙ্গে কেনেডির সম্পর্ক, ছিল পারিবারিক আপত্তির গুঞ্জন, ছিল সংবাদমাধ্যমের কৌতূহল। ১৯৯৪ সালে অবশেষে শুরু হয় জন ও ক্যারোলিনের প্রেম-নীরব, কিন্তু গভীর।
১৯৯৫ সালের এক বিকেলে, ম্যাসাচুসেটসের মার্থাস ভিনইয়ার্ডে মাছ ধরার নৌকায় কেনেডি হাঁটু গেড়ে বসেন। প্রস্তাব সহজ, কিন্তু আন্তরিক। ক্যারোলিন সঙ্গে সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলেননি। তিন সপ্তাহ পর তিনি রাজি হন—যেন নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, ভালোবাসা কেবল আবেগ নয়, দায়বদ্ধতাও।
তাঁদের সম্পর্ককে অনেকে তুলনা করতেন কেনেডির বাবা-মা-John F. Kennedy ও Jacqueline Kennedy Onassis–এর সঙ্গে। মিডিয়া চাইত নতুন এক ‘জেএফকে–জ্যাকি’। কিন্তু বাস্তব ছিল ভিন্ন। পাপারাজ্জিদের নিরন্তর অনুসরণ, ব্যক্তিগত মুহূর্তের প্রকাশ্য বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে তাঁদের জীবন ছিল এক অবিরাম প্রদর্শনী।

১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে, জর্জিয়ার কাম্বারল্যান্ড দ্বীপে গোপনে বিয়ে করেন তাঁরা। ছোট্ট চার্চ, হাতে গোনা অতিথি, আর কঠোর গোপনীয়তা, আধুনিক সময়ের অন্যতম রহস্যময় তারকা বিয়ে। কিন্তু বিয়ের পরও শান্তি আসেনি। ক্যারোলিনের নীরবতা তাঁকে ‘আইস কুইন’ তকমা দেয়; কেনেডি বারবার অনুরোধ করেন ব্যক্তিগত পরিসরের জন্য।
তবু ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তাঁরা একে অন্যকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ঝগড়া ছিল, আবেগ ছিল, ছিল মিলনের আকুলতা। আর ছিল একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।
১৬ জুলাই ১৯৯৯ সেই স্বপ্ন থেমে যায়। সমুদ্র তাঁদের গ্রাস করলেও, আমেরিকার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে তাঁরা রয়ে গেছেন আধুনিক রাজকীয় প্রেমের প্রতীক হয়ে। আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুগল-যাদের ভালোবাসা ছিল বাস্তব, কিন্তু পরিণতি ট্র্যাজিক।
হয়তো এ কারণেই তাঁদের গল্প এখনো টানে, কারণ এটি কেবল প্রেম নয়, খ্যাতির মূল্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সংগ্রাম আর নিয়তির নির্মমতার গল্প।



















