গুমের শিকার পরিবারের ভাতা বরাদ্দ এই বাজেটেই প্রতিশ্রুতি মির্জা ফখরুলের
- আপডেট সময় : ০৭:৩৪:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে: ছবি সংগ্রহ
মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকেও ভাতা দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটেই বরাদ্দের ব্যবস্থা করবেন।
আজ শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল এ কথাগুলো বলেন। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। সংলাপের যৌথ আয়োজক হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) ও মায়ের ডাক।
বাবার ছবি হাতে নিয়ে সংলাপে যোগ দেন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হয়ে যাওয়া কাওসার হোসেনের মেয়ে মেয়ে লামিয়া। তার বক্তব্য ছিলো এমন, আমার বাবাকে এবং আদনান চাচ্চুকে রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এক যুগেরও বেশি হয়ে গেছে, আমি আমার বাবাকে দেখিনি। আমার বাবাকে যখন নিয়ে গেছে, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সে সময় আমি বুঝতাম না বাবা মানে কী।

মির্জা ফখরুল বলেন, বারবার বলেছি, যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে কেন ভাতা দেওয়া হবে না? অবশ্যই ভাতা দিতে হবে এবং সেটা আমরা এই বাজেটেই প্রভিশন রাখার ব্যবস্থা করব।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনো পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগুলো পূরণ করা যাবে না। পাশে তো দাঁড়াতে পারি, সাহস দিতে পারি। ভবিষ্যৎ নির্মাণের ব্যবস্থা রাষ্ট্র করতে পারে।’
এ ধরনের ঘটনায় সম্মিলিতভাবে প্রতিকারের আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রকাশ্যে এদের বিচার হওয়া উচিত, শাস্তি হওয়া উচিত।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ লোক জিয়া (বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান), সে ধরা পড়েছে, তার বিচার হচ্ছে। আরেকজন ধরা পড়েছে দুবাইয়ে বেনজীর (পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ)। তাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল, তাদের যে অহংকার, দাম্ভিকতা ছিল, দেখুন, আল্লাহ ঠিক হাজির করছেন আদালতের সামনে, জনগণের সামনে।

বিশ্বাস করি, একে একে প্রত্যেকে ধরা পড়বে, প্রত্যেকের বিচার হবে। আল্লাহ আমাদের সেটা দেখাবেন—আমি এটা বিশ্বাস করি।’
গুম ও নির্যাতনের ঘটনাকে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গুম হওয়া, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া, এগুলো নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না। এ ব্যাপারে আমরা সবাই এক। আমরা বিচার চাই। তাঁদের (ভুক্তভোগী) পাশে দাঁড়াতে চাই। তাঁদের স্বীকৃতি চাই। আইনের যে শক্তি, সেই শক্তি তাঁদের হাতে তুলে দিতে চাই।’
মায়ের ডাকের আন্দোলনের প্রসঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, যখন কেউ কথা বলার সাহস পায়নি, তখন একটি মেয়ে (বর্তমান জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি) রাস্তায় নেমেছে। জেনেভা পর্যন্ত গেছে। ভবিষ্যতে আর কাউকে যেন এমন কষ্টের শিকার হতে না হয়।
এক যুগেরও বেশি হয়ে গেছে, বাবাকে দেখিনি
সংলাপে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া চালক কাওসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম। বাবা জীবিত নাকি মারা গেছেন, সেটিও জানেন না তিনি।
বাবার সঙ্গে তেমন কোনো স্মৃতি মনে নেই বলে জানান লামিয়া। তিনি বলেন, তাঁর বাবা সকালে কাজে যেতেন, তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকতেন। বাবা রাতে ফিরে এসে তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতেন। বাবার সঙ্গে তোলা একটি ছবি ছাড়া তাঁর আর কোনো স্মৃতি নেই।
২০২৫ সালের ৫ জুন ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন লামিয়া। তিনি বলেন, ‘আয়নাঘরের একেকটা সেল, সেটা বলে বোঝানো যাবে না। ওই সেলগুলোর নামই ছিল কবর সেল, যেখানে একজন সুস্থ মানুষ পাঁচ মিনিট থাকলে সে–ও অসুস্থ হয়ে যাবে।
ওই সেলে আমার বাবা, আমার চাচ্চুরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর থেকেছেন। খাবার দিয়েছে কি না, কী নির্যাতন করেছে, আমি জানি না। কারা করেছে, সেটাও এখনো জানি না। কিন্তু আমি তার বিচার চাই।’
লামিয়া বলেন, মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামের সঙ্গে আয়নাঘরে হাঁটার সময় একটি দেয়ালে তিনি তাঁর মায়ের নাম দেখতে পান। সেখানকার একটি ছোট সেলের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে ভালোভাবে দাঁড়ানো, বসা কিংবা শুয়ে ঘুমানো যায় না।
লামিয়া বলেন, ‘আমি তো কিছু চাইনি। আমি শুধু…বিচার চেয়েছিলাম। আমি আমার বাবাকে ফেরত চেয়েছিলাম। ওরা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেয়নি। কেউ জিজ্ঞাসা করলে আমি বলতে পারি না, আমার বাবার কী হয়েছে। আমার বাবা জীবিত নাকি মৃত, আমি সেটা জানি না।

বাবা মারা গেলেও অন্তত একটি কবর থাকত উল্লেখ করে লামিয়া বলেন, ‘আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারতাম, এটা আমার বাবার কবর। আমার কাছে ওইটাও নেই। আমি সেই ছোটবেলা থেকে বাবার একটা ছবি নিয়েই হাঁটি। আর জানি, এটা আমার বাবা।’
বাংলার মাটিতে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেব না
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম সংলাপে বক্তব্য দেন। আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি দীর্ঘদিন গুম ছিলেন। লামিয়ার বক্তব্য শুনে নিজের মেয়েদের কথা মনে পড়েছে জানিয়ে মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, দীর্ঘ আট বছর মায়ের ডাকের অনুষ্ঠান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য একটি মিলনমেলার জায়গা ছিল। সেখানে তারা নিজেদের দুঃখ–কষ্টের কথা বলত। একটি পরিবারের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারত।
মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে গুমের ভুক্তভোগীরা নিজ দেশেই উদ্বাস্তু ছিল। গুমের শিকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছে। তাদের আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?
গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর তিনটি দাবির কথা তুলে ধরেন মীর আহমাদ বিন কাসেম। প্রথম দাবি হিসেবে তিনি জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কথা বলেন। দ্বিতীয় দাবি পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ। তৃতীয় দাবি হিসেবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ‘যাদের পরিবারের প্রিয় মানুষটি ফিরে আসেনি, তাদের ক্ষতিপূরণ কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু অন্তত তারা যেন অর্থনৈতিকভাবে আরেকজনের কাছে মুখাপেক্ষী না হয়, এতটুকু দায়িত্ব কি সরকার নিতে পারে না?’

ভবিষ্যতে আর কাউকে যেন এমন পরিণতি বরণ করতে না হয়, সে জন্য শক্ত আইন ও সরকারের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মীর আহমাদ বিন কাসেম। তিনি বলেন, জুলাই জাদুঘরকে লালন করতে হবে। এই জাদুঘর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ফ্যাসিবাদ চেনার পাঠশালা হয়ে উঠতে পারে।
গুমের শিকার সব পরিবারের তালিকা করে এককালীন অথবা মাসিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান মীর আহমাদ বিন কাসেম। তিনি বলেন, অনেক পরিবার ঢাকায় এসে সরকারের সামনে নিজেদের কষ্টের কথা বলার সুযোগও পায় না। তাদের যেন আর একটি দিনও অপেক্ষা করতে না হয়।
মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, এই বাংলার মাটিতে আমরা আর কোনো দিন কোনো ফ্যাসিবাদের কার্যক্রম ফিরে আসতে দেব না। ভিকটিম পরিবারগুলোকে সরকার নিজের করে নিক, তাদের আশ্রয় দিক। যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার উপশম ও নিরাময়ের ব্যবস্থা করুক।
সংলাপে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ভেসে যাওয়া অনেক গুলিবিদ্ধ লাশ মুন্সিগঞ্জে উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই সময় যাঁরা গুম হয়েছেন, সেগুলো তাঁদের লাশ হতে পারে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
নূর খান বলেন, উদ্ধার করা লাশগুলোর সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনা এবং এখনো ফিরে না আসা গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখা দরকার।
সংলাপের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম। সংলাপে ‘সাপোর্ট লাইফ আফটার টর্চার’ শীর্ষক অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অধিবেশনে আইনপ্রণেতা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং গুম-নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।


















