প্রাচীন নগরসভ্যতার ইতিহাসে মহেঞ্জোদারো এক অনন্য বিস্ময়
- আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
প্রাচীন নগরসভ্যতার ইতিহাসে মহেঞ্জোদারো এক অনন্য বিস্ময়। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ অব্দে সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই নগরী ছিল সিন্ধু সভ্যতা-এর অন্যতম বৃহত্তম ও সুপরিকল্পিত শহর। ব্রোঞ্জ যুগে বিকশিত এই নগর শুধু আকারেই নয়, উন্নত নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্যও ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
মহেঞ্জোদারোর বিস্তৃত রাস্তা, সমান্তরাল নগর বিন্যাস এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, সেই সময়কার মানুষরা নগরজীবন সম্পর্কে কতটা সচেতন ও দক্ষ ছিলেন। প্রতিটি বাড়িতে পানির ব্যবস্থা, পাকা নিকাশী এবং গণস্নানাগারের মতো স্থাপনা ছিল, যা আধুনিক নগর পরিকল্পনার সঙ্গে তুলনীয়।
দীর্ঘকাল মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই নগরীর অস্তিত্ব আধুনিক বিশ্ব জানতে পারে ১৯২২ সালে, যখন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এটি পুনরাবিষ্কার করেন। তাঁর এই আবিষ্কার প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং সিন্ধু সভ্যতার গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।

খননকাজে পাওয়া বিভিন্ন নিদর্শন, যেমন সিলমোহর, মৃৎপাত্র অলংকার ও খেলনা, ইঙ্গিত দেয় যে মহেঞ্জোদারোর মানুষরা শুধু প্রযুক্তিতে নয়, শিল্প ও সংস্কৃতিতেও সমৃদ্ধ ছিল। যদিও এই উন্নত নগরীর পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো রহস্যাবৃত, তবুও এটি মানবসভ্যতার প্রাচীন অগ্রযাত্রার এক জীবন্ত দলিল হয়ে রয়েছে।
প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে মহেঞ্জোদারো এক রহস্যময় ও বিস্ময়কর নাম। বর্তমান পাকিস্তান-এর সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় অবস্থিত এই নগর একসময় ছিল মানবসভ্যতার অগ্রগতির উজ্জ্বল প্রতীক। এটি সিন্ধু সভ্যতা-এর অন্যতম বৃহত্তম ও পরিকল্পিত নগর হিসেবে পরিচিত। একই সময়ে বিকশিত প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়া-র মতো উন্নত সভ্যতার সঙ্গে এর তুলনা করা হয়।
তবে সময়ের নির্মম পরিক্রমায় এই গৌরবময় শহর আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গবেষকরা এখনো এর পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে একমত হতে পারেননি। সাম্প্রতিক সময়ে জার্মান গবেষক মিশায়েল

ইয়ানসেন ‘ফ্রেন্ডস অব মহেঞ্জোদারো’ নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রাচীন নগরকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করার পাশাপাশি এর বিলুপ্তির কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছেন।
বর্তমানে মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায় ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা প্রাচীন ইটের গঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততাও ধ্বংসস্তূপের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটকদের অসচেতন আচরণ, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা কিংবা ধ্বংসাবশেষে ওঠানামা করা, যা এই ঐতিহ্যকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
খননকাজে পাওয়া সিলমোহর, অলংকার, মুদ্রা, খেলনা ও বাঁশির মতো নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে, এই শহরের মানুষরা ছিল শিল্প ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। আজ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে মহেঞ্জোদারো শুধু অতীতের গল্পই বলে না, বরং মানবসভ্যতার শেকড়ের সঙ্গে আমাদের সংযোগও স্মরণ করিয়ে দেয়।



















