আইনের জালে পুলিশ দম্পতি অসহায় গৃহকর্মীর ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন
- আপডেট সময় : ০১:৪৯:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
গৃহকর্মীর শরীরে কড়াইয়ের ছ্যাঁকা, মানবতার মুখে আরেকটি কলঙ্ক
খুলনার সোনাডাঙ্গায় ঘটে যাওয়া গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি মানবতা, বিবেক এবং সামাজিক মূল্যবোধের ওপর নির্মম আঘাত। যে মানুষগুলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শপথ নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেই যখন এমন নিষ্ঠুরতার অভিযোগ ওঠে, তখন সমাজের মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সোনাডাঙ্গা থানায় কর্মরত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সঞ্জয় মিত্র ও তার স্ত্রী এএসআই পপি মিত্র নিজেদের বাসায় কর্মরত এক কিশোরী গৃহকর্মীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ বুধবার যে ঘটনার কথা সামনে এসেছে, তা বিবেকবান যেকোনো মানুষকে নাড়া দেওয়ার মতো। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গরম কড়াই দিয়ে মেয়েটির মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। যন্ত্রণায় কাতর শিশুটি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে কান ধরে উঠবস করানো হয়। এ দৃশ্য জানালা দিয়ে দেখে প্রতিবেশীরা স্তম্ভিত হয়ে যান।
একটি তরকারি হাত থেকে পড়ে যাওয়ার মতো সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন গৃহকর্মীর ওপর এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গৃহকর্মী মানে দাস বা ক্রীতদাস নয়; তিনি একজন মানুষ, যারও সম্মান, অধিকার এবং নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের বহু গৃহকর্মী এখনো নীরবে নির্যাতনের শিকার হন, যাদের অধিকাংশ ঘটনার খবর কখনো প্রকাশই পায় না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগীর শরীরে পুরনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিক নির্যাতনের একটি ভয়াবহ চিত্র। প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে চলা এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে কেউ কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি? সমাজের চারপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতি আমাদের নীরবতা অনেক সময় অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
ভুক্তভোগীর মা মামলা করার পর অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং নির্যাতিত কিশোরীকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু গ্রেফতারেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আইনের রক্ষক যদি আইনের লঙ্ঘনকারী হয়ে ওঠেন, তাহলে তাদের অপরাধ সাধারণ মানুষের তুলনায় আরও গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা কখনোই কাউকে অন্য মানুষের ওপর অত্যাচার করার অধিকার দেয় না। একজন অসহায় কিশোরীর শরীরে কড়াইয়ের ছ্যাঁকা শুধু তার দেহকে ক্ষতবিক্ষত করেনি, এটি আমাদের সমাজের মানবিক চেতনাকেও আহত করেছে। মানবতা, ন্যায়বিচার এবং শিশুর অধিকার রক্ষার স্বার্থে এ ঘটনার সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত হওয়া এখন সময়ের দাবি।



















