ঢাকা ০১:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চাউলের দাম বৃদ্ধির খবরে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রথানমন্ত্রীর নির্দেশ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ কেন অবৈধ নয় জানতে চেয়ে হাই কোর্টের রুল সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি নির্দেশনা দূতাবাসের ঈদযাত্রা ঘিরে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু, টার্মিনাল ও স্টেশনে ভিড় দুবাই ছাড়তে ধনকুবেরদের হুড়োহুড়ি, প্রাইভেট জেটের ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে গতি আনতে একমত ঢাকা-দিল্লি চাঁদাবাজি-ছিনতাই দমনে জিরো টলারেন্স: মাঠ পর্যায়ে কঠোর বার্তা আইজিপির কুয়েতে তিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, কারণ জানাল যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের ‘নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু আর নেই

শিকল বাঁধা জীবনের গল্প!

উদয়ন চৌধুরী, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০৮:৩০:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৩০৪ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রোস্তম আলী ও আম্বিয়া বেগম, ছবি সংগ্রহ

সুস্থ থাকলে আম্বিয়া বেগম (২৬) দু’একটি সন্তানের মা হতো। আর ছোট ভাই রোস্তম আলী (২৪) হয়তো বিয়ে করে ঘরসংসার করতো।  দুটো  জীবনই আজ অসহায়। মানসিক ভারসাম্যহীনতা তাদের জীবনের স্বপ্ন মুছে দিয়েছে। যুগ পেরিয়ে গিয়েছে শিকলবন্দি জীবনের।  এছাড়া কোন উপায় দেখছেন না মা রওশন আরা!

রওশন আরার দু’চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকার। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে থা দিয়ে যেখানে স্বস্তি পেতেন, তার বদলে কিনা চরম অশান্তিতে নির্ঘুম রাত কাটছে তার! দুঃচিন্তায় ক’টি রাত নিশ্চিত ঘুমিয়েছেন তা ভুলে গিয়েছেন রওশন আরা।

অর্থের অভাবে দুই সন্তানের সুচিকিৎসা করাতে পারছেন না। আর কি করেই বা পারবেন? যেখানে দু’বেলা আহার যোগানোটাই কষ্টের, সেখানে সন্তানদের চিকিৎসার সুযোগ কোথায়? দারিদ্রতার অভিশাপ সংসারের সকল শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ফলে সন্তানদের রক্ষায় এক যুগ ধরে ভরসা তার

লোহার শিকল। দু’সন্তানের পায়ে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। দিনের বেলা একচিলতে উঠুনে, আর রাতে ঘরের চৌকির পায়ার সঙ্গে। বিছায় শুনে চোখের জলে বুক ভাসান মা রওশন। দারিদ্রতা তাদের জীবনের গল্প থামিয়ে দিয়েছে।

ঢাকা থেকে ৪৪১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে জয়পুরহাট। জেলার উত্তর দিকে গুরুতবপূর্ণ বন্দর দিনাজপুরের হিলি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁ জেলার অন্তর্গত প্রত্মতাত্তিবক নির্দশন পাহাড়পুর। এলাকায় সবসময় লোকের সমাগম ঘটে। প্রতিদিন হিলি বন্দর থেকে জয়পুরহাট ও বগুড়ার মোকামতলা হয়ে ঢাকা ও অন্যান্য এলাকাতে অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে থাকে।

এই জয়পুরহাটের একটি উপজেলার কালাই। এখানের মাত্রাই ইউনিয়নের বিয়ালা গ্রামের আতার পাড়া সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ও রওশন আরা। তাদের দুই সন্তান মেয়ে আম্বিয়া বেগম ও  ছেলে রোস্তম আলী মানসিক ভারসাম্যহীন। সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের বাড়িতে ভাঙ্গা টিনের বেড়া এবং টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে শিকলবন্দি  দুই সন্তান নিয়ে থাকেন তারা। 

সংবাদমাধ্যমে তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন রওশন আরা। জানান, স্বামী রফিকুল ইসলাম দিনমজুরের কাজ করে যা পান তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চালান। মাঝেমধ্যে অন্যের বাড়িতে ঝিঁ-এর কাজ করেন। ২৮ বছরের সংসার জীবনে জন্ম নেন দুই সন্তান। বছর ১২ থেকেই মেয়ের

অস্বাভাবিক আচরণ। এ সময় স্থানীয় এক কবিরাজের পরামর্শে কিশোরী আম্বিয়াকে পাশের গ্রামের দিনমজুর মনোয়ারের সঙ্গে বিয়েও দেন। কিন্তু মাস তিনেক পরই মেয়ের অবস্থা বেশি

খারাপের দিকে যায়। বগুড়া, পাবনা ও রংপুরে নিয়েও চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

একমাত্র ছেলের অবস্থাও তাই। ১২ বৎসর বয়স থেকে তারও ভিন্ন রকমের আরচরণ। অবশেষে তাদের রক্ষায় পড়ানো হয় শিকল। এভাবেই কেটে গিয়েছে একযুগ।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ.ন.ম. শওকত হাবিব তালুকদার লজিক জানান, তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তাদের সু-চিকিৎসার জন্য সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারেও সার্বিক চেষ্টা করছেন তিনি।

কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন রেজার মতে বলেন, তাদের উন্নত পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হলে ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার টুকটুক তালুকদার খবর পেয়ে নিজেই ছুটে যান এবং বাসায় খোঁজ খবর নেন। পরিবারকে কিছু নগদ অর্থও তুলে দেন তিনি। তাদের চিকিৎসার জন্য

হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে তাদের কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন। কাগজ-পত্র হাতে পেলেই প্রশাসনের তরফে চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শিকল বাঁধা জীবনের গল্প!

আপডেট সময় : ০৮:৩০:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

রোস্তম আলী ও আম্বিয়া বেগম, ছবি সংগ্রহ

সুস্থ থাকলে আম্বিয়া বেগম (২৬) দু’একটি সন্তানের মা হতো। আর ছোট ভাই রোস্তম আলী (২৪) হয়তো বিয়ে করে ঘরসংসার করতো।  দুটো  জীবনই আজ অসহায়। মানসিক ভারসাম্যহীনতা তাদের জীবনের স্বপ্ন মুছে দিয়েছে। যুগ পেরিয়ে গিয়েছে শিকলবন্দি জীবনের।  এছাড়া কোন উপায় দেখছেন না মা রওশন আরা!

রওশন আরার দু’চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকার। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে থা দিয়ে যেখানে স্বস্তি পেতেন, তার বদলে কিনা চরম অশান্তিতে নির্ঘুম রাত কাটছে তার! দুঃচিন্তায় ক’টি রাত নিশ্চিত ঘুমিয়েছেন তা ভুলে গিয়েছেন রওশন আরা।

অর্থের অভাবে দুই সন্তানের সুচিকিৎসা করাতে পারছেন না। আর কি করেই বা পারবেন? যেখানে দু’বেলা আহার যোগানোটাই কষ্টের, সেখানে সন্তানদের চিকিৎসার সুযোগ কোথায়? দারিদ্রতার অভিশাপ সংসারের সকল শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ফলে সন্তানদের রক্ষায় এক যুগ ধরে ভরসা তার

লোহার শিকল। দু’সন্তানের পায়ে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। দিনের বেলা একচিলতে উঠুনে, আর রাতে ঘরের চৌকির পায়ার সঙ্গে। বিছায় শুনে চোখের জলে বুক ভাসান মা রওশন। দারিদ্রতা তাদের জীবনের গল্প থামিয়ে দিয়েছে।

ঢাকা থেকে ৪৪১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে জয়পুরহাট। জেলার উত্তর দিকে গুরুতবপূর্ণ বন্দর দিনাজপুরের হিলি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁ জেলার অন্তর্গত প্রত্মতাত্তিবক নির্দশন পাহাড়পুর। এলাকায় সবসময় লোকের সমাগম ঘটে। প্রতিদিন হিলি বন্দর থেকে জয়পুরহাট ও বগুড়ার মোকামতলা হয়ে ঢাকা ও অন্যান্য এলাকাতে অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে থাকে।

এই জয়পুরহাটের একটি উপজেলার কালাই। এখানের মাত্রাই ইউনিয়নের বিয়ালা গ্রামের আতার পাড়া সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ও রওশন আরা। তাদের দুই সন্তান মেয়ে আম্বিয়া বেগম ও  ছেলে রোস্তম আলী মানসিক ভারসাম্যহীন। সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের বাড়িতে ভাঙ্গা টিনের বেড়া এবং টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে শিকলবন্দি  দুই সন্তান নিয়ে থাকেন তারা। 

সংবাদমাধ্যমে তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন রওশন আরা। জানান, স্বামী রফিকুল ইসলাম দিনমজুরের কাজ করে যা পান তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চালান। মাঝেমধ্যে অন্যের বাড়িতে ঝিঁ-এর কাজ করেন। ২৮ বছরের সংসার জীবনে জন্ম নেন দুই সন্তান। বছর ১২ থেকেই মেয়ের

অস্বাভাবিক আচরণ। এ সময় স্থানীয় এক কবিরাজের পরামর্শে কিশোরী আম্বিয়াকে পাশের গ্রামের দিনমজুর মনোয়ারের সঙ্গে বিয়েও দেন। কিন্তু মাস তিনেক পরই মেয়ের অবস্থা বেশি

খারাপের দিকে যায়। বগুড়া, পাবনা ও রংপুরে নিয়েও চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

একমাত্র ছেলের অবস্থাও তাই। ১২ বৎসর বয়স থেকে তারও ভিন্ন রকমের আরচরণ। অবশেষে তাদের রক্ষায় পড়ানো হয় শিকল। এভাবেই কেটে গিয়েছে একযুগ।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ.ন.ম. শওকত হাবিব তালুকদার লজিক জানান, তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তাদের সু-চিকিৎসার জন্য সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারেও সার্বিক চেষ্টা করছেন তিনি।

কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন রেজার মতে বলেন, তাদের উন্নত পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হলে ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার টুকটুক তালুকদার খবর পেয়ে নিজেই ছুটে যান এবং বাসায় খোঁজ খবর নেন। পরিবারকে কিছু নগদ অর্থও তুলে দেন তিনি। তাদের চিকিৎসার জন্য

হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে তাদের কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন। কাগজ-পত্র হাতে পেলেই প্রশাসনের তরফে চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হবে।