চারুকলায় বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি: দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ
- আপডেট সময় : ০৫:৪৪:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। পুরনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করে নেওয়ার এই অনন্য আয়োজনে প্রতি বছরই প্রাণ ফিরে পায় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা চত্বর এখন যেন রঙ, তুলির আঁচড় আর সৃজনশীলতার এক জীবন্ত ক্যানভাস।
চারুকলার আঙিনাজুড়ে চলছে বর্ষবরণকে ঘিরে নিঃশব্দ অথচ গভীর এক কর্মযজ্ঞ। শিল্পীদের মমতায় কাগজ, বাঁশ, কাপড় আর রঙের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে মুখোশ, পেঁচা, ঘোড়া, মোরগসহ নানা প্রতীকী শিল্পকর্ম। প্রতিটি সৃষ্টির ভেতরেই ফুটে উঠছে গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য, বিশ্বাস আর জীবনচিত্র।
এবারের আয়োজন যেন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও বর্ণিল। চারুকলার উত্তর পাশের বারান্দা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই সৃজনপ্রবাহ, যেখানে নবীন-প্রবীণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও সমানতালে অংশ নিচ্ছেন।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চারুকলার প্রবেশদ্বারে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত মানুষজনের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ শিল্পকর্ম দেখছেন, কেউবা কিনছেন প্রিয় কোনো নিদর্শন। এসব বিক্রয়লব্ধ অর্থই ব্যয় হয় বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজনের পেছনে, যা এই উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
গেটে প্রবেশ করেই আবাক চোখে তাকায় সঙ্গী নাসিরুল ইসলাম। চারুকলার লম্বা বারান্দা ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে বিশাল আকারের পটচিত্র। সেখানে স্থান পেয়েছে সম্রাট আকবর, বনবিবি, বেহুলা-লখিন্দর কিংবা গাজীরপট, যা বাঙালির ঐতিহাসিক ও লোকজ ধারার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। প্রতিটি চিত্র যেন কথা বলে, শোনায় অতীতের গল্প, তুলে ধরে সংস্কৃতির গভীর শেকড়। এসব পটচ্রিত্রের সামনে নাসির ভাইয়ের কয়েকটি ছবিতেুলে নিলাম।

এখানেই দেখা মেলে লেখক সুহিতা সুলতানার সঙ্গে বৈশাখ প্রসঙ্গে বলেন, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসব আমাদের শেকড়ের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। চারুকলার এই আয়োজন আমাদের সংস্কৃতির বহুমাত্রিক রূপকে তুলে ধরে, যেখানে গ্রামবাংলার সরলতা আর শহুরে সৃজনশীলতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে।
তিনি আরও বলেন, নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে আমরা যে আনন্দে, রঙে আর মিলনের বার্তা নিয়ে পথচলা শুরু করি, তা শুধু উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি হোক আমাদের জীবনদর্শন। সাম্প্রদায়িকতা, বিভাজন আর সংকীর্ণতা পেরিয়ে পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় একসঙ্গে বাঁচতে, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতে।
তার মতে, চারুকলা চত্বরে তৈরি হওয়া প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন এক একটি বার্তা, বাঙালির ঐতিহ্য, ইতিহাস আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই আয়োজন শুধু চোখের আনন্দই নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা।

নাসিরুল ইসলাম বলেন, এ আয়োজন কেবল শিল্পের প্রদর্শনী নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রকাশ। তার ভাষায়, পহেলা বৈশাখ এমন এক উৎসব যা মানুষকে তার শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। গ্রামবাংলার সরলতা আর শহুরে সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চারুকলা চত্বরে তৈরি প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন একেকটি বার্তা বহন করে, ঐক্যের, সৌহার্দ্যের এবং মানবিকতার। এখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে যে আনন্দ, রঙ আর মিলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, তা শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং হয়ে ওঠে জীবনদর্শনের অংশ।

বৈশাখী শোভাযাত্রা এই উৎসবের প্রাণ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো মানুষ অংশ নেয় এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায়। বিশাল মুখোশ, রঙিন প্রতীক আর লোকজ সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয় চারপাশ। এটি শুধু একটি শোভাযাত্রা নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও গৌরবের প্রতীক।
দিন যতই যাচ্ছে, এই আয়োজনের পরিধি ততই বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে উঠছে এক জীবন্ত পাঠশালা, যেখানে তারা শিখছে নিজেদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয় সম্পর্কে। চারুকলার বকুলতলা তাই কেবল একটি স্থান নয়; এটি বাঙালির অহংকার, ভালোবাসা আর চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় ভেদাভেদ ভুলে, সংকীর্ণতা পেরিয়ে একসঙ্গে বাঁচতে, স্বপ্ন দেখতে। আর সেই স্বপ্নের রঙেই রঙিন হয়ে ওঠে চারুকলার প্রতিটি কোণ, প্রতিটি শিল্পকর্ম, প্রতিটি মানুষের হৃদয়।

















