ইসলামে ধর্মান্তরিত বন্দীদের দেখা হয় সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী হিসেবে, বাড়ে সাজা
- আপডেট সময় : ০৩:২৩:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ মার্চ ২০২৫ ১৮৩ বার পড়া হয়েছে
রক্ত হিম করা ঠান্ডার মধ্যে ২০২৩ সালের নভেম্বরে যখন সাইবেরিয়ার কারাগারে পাঠানো হয়, তখন রুটি ও জাউ ছাড়া নরিমান ঝেলইয়ালের খাওয়ার মতো কিছু ছিল না।
চশমা পরা, শ্মশ্রুমণ্ডিত ক্রিমীয় তাতার সম্প্রদায়ের এই নেতা একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তিনি বলেন, কারাগারে তাকে যেসব খাবার দেওয়া হতো, সেসবের বেশির ভাগ ছিল শূকরের মাংসের তৈরি। কিন্তু ইসলামি আইনে এটি নিষিদ্ধ।
ঝেলইয়াল আল-জাজিরাকে বলেন, আমি শুধু রুটি খেতাম, তা ভালো মানের ছিল না। এ রুটি চায়ে ভিজিয়ে খেতাম। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের লাইন উড়িয়ে দেওয়া ও বিস্ফোরক চোরাচালানের অভিযোগে তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন বলেছে, এটা মস্কোর পরিকল্পিত ঘটনা।
ঝেলইয়াল তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। কয়েক দিন পর ঝেলইয়ালকে সাইবেরিয়ার কারাগার থেকে মিনুসিনস্ক শহরে স্থানান্তর করা হয়। এখানে এসে তুলনামূলক কিছুটা ভালো খাবার পান তিনি।
মিনুসিনস্কের কারাগারে সকালের নাশতা ছিল স্বাদহীন, মিষ্টি ছাড়া জাউ, রাতের খাবারে থাকত মাছ, দুপুরে শূকরের মাংস।
কিন্তু রাশিয়ার কুখ্যাত কারাব্যবস্থায় হাজার হাজার মুসলিম বন্দীর জন্য খাবারই শুধু বড় সমস্যা নয়, গত শতক ধরেই সোভিয়েত ও বর্তমান রাশিয়ার কারাগারগুলো এক অন্ধকার জগৎ হয়ে রয়েছে। এগুলো পরিচালিত হচ্ছে অলিখিত সব আইনে।
এসব কারাগারে ‘ক্রাউন্ড থিভস’ বা ‘দ্য ব্ল্যাক ক্যাস্ট’ নামে পরিচিত দুর্র্ধষ অপরাধীদের শরীরে এখনো ট্যাটু দেখা যায়, কথাবার্তায় শোনা যায় অশ্লীল শব্দের ব্যবহার। তারা নিজেরা একটি কঠোর ও নিষ্ঠুর আদেশশৃঙ্খল বজায় রেখে চলেন।
দুর্র্ধষ এ অপরাধীরা যেসব কারাগার নিয়ন্ত্রণ করেন, সেসব ব্ল্যাক প্রিজনস বলে পরিচিত। কারাগারগুলোতে কারা তত্ত্বাবধায়ক ও ক্রাউন্ড থিভসদের মধ্যে সংঘর্ষ, মাদক চোরাচালান, কার্ড গেম ও বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
রেড প্রিজনস কারাগারগুলোতে তত্ত্বাবধায়কেরা বেশ প্রভাবশালী। সেখানকার সাধারণ অপরাধীদের অভিযোগ, কারা তত্ত্বাবধায়কেরা এখানে এক অমানবিক পরিবেশ তৈরি করে রাখেন। এর মধ্যে বন্দীদের ওপর নির্যাতন, নির্জন কারাবাস, তাদের অপুষ্টিতে রাখা ও ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে।
কিন্তু দুই দশক ধরে রাশিয়ার কারাগারগুলোতে দেখা যাচ্ছে আরেক শ্রেণির বাসিন্দাদের। তারা হলেন মুসলিম। সন্ত্রাসী কাজ, উগ্র কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য অভিযোগ এনে কারাগারে ঢোকানো হচ্ছে তাদের।
রাশিয়ার ১৪ কোটি ৩০ লাখ অধিবাসীর প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলিম। দেশটিতে জনসংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পেলেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা বাড়ছে।
রাশিয়ার মুফতি আলবির ক্রাগানভ গত নভেম্বরে জানান, কারাগারগুলোতেও মুসলিম বন্দীদের হার একই রকম। ২ লাখ ৬ হাজার বন্দীর মধ্যে মুসলিম ৩১ হাজার।
মস্কো ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর থেকে রাশিয়ার কারাগারের কয়েদির অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। তবে ক্ষমার বিনিময়ে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণকারী বা তালিকাভুক্ত হওয়া মুসলিম বন্দীদের সংখ্যা অজানাই রয়েছে।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেই বিপদ বাড়ে
বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়ার যেসব বন্দী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীর তালিকায় ঢুকে যান। কখনো কখনো উগ্রপন্থার অভিযোগ এনে তাঁদের কারাদণ্ডের মেয়াদও বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
রাশিয়ার সংশোধনাগারগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দেশটির প্রধান সংগঠন ‘ফেডারেল সার্ভিস ফর এক্সিকিউশন অব পানিশমেন্ট-এর সাবেক বিশ্লেষক আনা কারেতনিকোভা। আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, একজন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি তার ধর্মবিশ্বাস ছেড়ে অর্থোডক্স খ্রিষ্টান কিংবা প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান মতাদর্শ গ্রহণ করলে তাকে স্বাগত জানানো হয়।
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, যদি কেউ নিজ ধর্মবিশ্বাস বদলে ইসলামে দীক্ষিত হন, তবে তিনি এমন একজন হিসেবে তালিকাভুক্ত হবেন, যিনি উগ্রপন্থায় ঝুঁকছেন বলে ধরা হয়। তার কারা প্রশাসনকে সাজা দেওয়া হবে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার দিকে বিশেষ নজর দেবে। কারেতনিকোভা রাশিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন মেমোরিয়ালেও কাজ করেছেন।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে রাশিয়ায় কাজ করতে যাওয়া মুসলিম অভিবাসীরা দেশটিতে ফৌজদারি বিচারের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। কেননা, তাঁদের রুশ ভাষা, বিদ্যমান আইন ও স্থানীয় জীবনপ্রণালি সম্পর্কে জানাশোনা কম থাকে।
এই অভিবাসীদের কাউকে কাউকে জোর করে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে বলেও খবরে জানা যায়। অন্যরা দাবি করেছেন, ভিন্ন ব্যক্তিদের সংঘটিত অপরাধ নিজেদের কাঁধে চাপিয়ে রাশিয়ার পুলিশ ও কৌঁসুলিরা তাঁদের নিশানা বানাচ্ছেন।
আবদুল আজিজ রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একজন নির্মাণকর্মী। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ২০২২ সালে তার ছোট ভাই আবদুল মুমিনকে স্পাইস নামের এক সিনথেটিক মাদকে ফাঁসিয়ে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ।
এই নির্মাণকর্মীর দাবি, পুলিশ তার ভাইকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে ও মারধর করে পার্কের বেঞ্চে মাদক লুকিয়ে রাখা নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চালায়।




















