রমজান সামনে আগেই চড়া বাজার: দামে লাগাম টানতে কড়া নজরদাবি জরুরি
- আপডেট সময় : ০৬:৪২:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ ৭০ বার পড়া হয়েছে
রমজানে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে, বিশেষত খেজুর, চিনি, সয়াবিন তেল, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও মশলার মতো পণ্যের; যা ইফতার ও সেহেরির জন্য অপরিহার্য, ফলে এই সময়ে এসব পণ্যের আমদানি ও মজুত বৃদ্ধি পায়, যদিও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে দাম বাড়ার প্রবণতাও দেখা যায়, তাই পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ও ব্যবসায়ীরা কাজ করে।
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর শুরু হতে যাচ্ছে মাহে রমজান। পবিত্র এই মাসকে সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের বাজারে আবারও অস্বস্তি বাড়ছে। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, এ যেন দেশে একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
তবে এবার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। রোজা শুরুর প্রায় এক মাস আগেই ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, চাল ও গমসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ আগেও প্রতি মণ সয়াবিন তেলের পাইকারি দাম ছিল ৬ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার একই মানের তেলের লেনদেন হয়েছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৬ হাজার ৮৫০ টাকায়। একইভাবে চিনির দাম মণপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়। ছোলার কেজিপ্রতি দাম ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়ে এখন ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আমদানি ও উৎপাদন মৌসুম শুরু হওয়ায় পেঁয়াজের দাম কিছুটা নিম্নমুখী থাকলেও আদা-রসুনসহ মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। দুই মাস ধরে স্থিতিশীল থাকা চালের বাজারেও ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গমের দাম মণপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়ায় এর প্রভাব পড়ছে আটা ও ময়দার খুচরা বাজারে।
রাজধানীর এক গৃহবধূ তাসকিনা সুলতানা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সরকার খেজুরে শুল্ক প্রত্যাহার করার পরও গত বছর অস্বাভাবিক দামে খেজুর বিক্রি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, শুল্ক কমালে যদি ভোক্তারা সুফল না পান, তবে সিদ্ধান্তের অর্থ কী? তার ভাষায়, রমজানে অন্তত ভোগ্যপণ্য নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তা করতে চাই না। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক সফিকুল ইসলাম মনে করেন, রমজানে ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তিনি বলেন, এই মাসে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে যায় এবং চাহিদা দ্বিগুণ হয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রমজানের অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস আগে আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও পাইকারি বাজারে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে খুচরা বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব। কিন্তু চলতি বছর সে প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট। তার মতে, ব্যবসায়ীদের কাছে ভোক্তারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে, আর এই জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে দেশে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। চিনি, সয়াবিন তেল, ডাল, ছোলা, মটর, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও খেজুরসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের আমদানি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এলসি নিষ্পত্তির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে নয়টি ভোগ্যপণ্যের আমদানি ছিল ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭১৩ টন। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৫০ টন, যা ৩০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকা এবং দেশে পর্যাপ্ত আমদানি সত্ত্বেও রমজানের আগেই দাম বাড়া স্পষ্টতই বাজার তদারকির দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আজ সোমবার রমজানের বাজার তদারকি নিয়ে বৈঠক ডাকলেও সম্ভাব্য রমজান শুরুর (১৮ ফেব্রুয়ারি) এক মাসেরও কম সময় আগে এ উদ্যোগকে অনেকেই বিলম্বিত বলে মনে করছেন। মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি শুরু হতে আরও সময় লাগবে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে, চাল, গম, পেঁয়াজ, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মটর, মসলা ও খেজুর এই ১০টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নগদ মার্জিন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে। নির্দেশনাটি তাৎক্ষণিক কার্যকর হয়ে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে এসব পণ্যের আমদানি ঋণপত্র খোলায় অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কেবল কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি জরুরি। সরকারকে নিজস্ব মজুদ বাড়াতে হবে এবং কৃত্রিম সংকট দেখা দিলেই বাজারে পণ্য ছাড়তে হবে।
একই সঙ্গে সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগই পারে রমজানে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে।



















