জাপানের সঙ্গে প্রথম ইপিএ সই: শুল্কমুক্ত বাজারে ৭ হাজারের বেশি বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ
- আপডেট সময় : ০৮:০২:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও ইপিএ চুক্তিতে সই করেন। আজ শুক্রবার জাপানের টোকিওতেছবি: পিআইডি
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট-ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে, শুক্রবার জাপানের টোকিওতে এই চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিসহ উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তথ্য অধিদপ্তরের এক বিবরণীতে জানানো হয়, পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এই তিনটি প্রধান খাতে সাত দফা দর-কষাকষির ফল হিসেবেই ইপিএ চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে।
চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাকসহ মোট ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাজার সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ জাপানের জন্য তার বাজার আংশিকভাবে উন্মুক্ত করছে, ফলে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা লাভ করবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন তাঁর বক্তব্যে ইপিএ চুক্তিকে বাংলাদেশ-জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। চুক্তিটির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পারস্পরিক সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ইপিএ চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তৈরি পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে কাঁচামালের উৎসসংক্রান্ত জটিল বিধিনিষেধ ছাড়াই বাংলাদেশি পোশাক সহজে জাপানে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং ও নার্সিংসহ প্রায় ১৬টি বিভাগে ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অপরদিকে, বাংলাদেশ জাপানের জন্য ১২টি বিভাগের আওতায় ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিকস খাতে জাপানি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। উন্নত জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্পখাতে উৎপাদন সক্ষমতা ও পণ্যের মান উন্নয়নে সহায়ক হবে, যা দেশকে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ইপিএ একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য, ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) ছাড়া এতদিন বাংলাদেশের কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যচুক্তি ছিল না। জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। সে সময় যৌথ গবেষণা দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দর-কষাকষির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করে। ঢাকায় ও টোকিওতে অনুষ্ঠিত সাত দফা আলোচনার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো।

















