ঢাকা ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সমর্থন করে: তৌহিদ হোসেন প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচার চাইলে গণতান্ত্রিক সরকার অপরিহার্য, তারেক রহমান গোপালগঞ্জ-৩: প্রার্থিতা ফিরে পেলেন হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামানিক কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর ৫৬ পর্যবেক্ষক মোতায়েন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে  এখনই অতি সতর্কতার প্রয়োজন নেই: ইইউ ইরান ভেনেজুয়েলা নয়: ট্রাম্পের জন্য সহজ নয় জয়ের পথ গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে তারেক রহমান, মানবিক আবেগে ভরা মতবিনিময় সভা খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল: ডা. এফ এম সিদ্দিকীর গুরুতর অভিযোগ কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ: রংপুরে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমাবেশ ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস: ঋণ-বিবাদে নৃশংসভাবে খুন মা ও কিশোরী মেয়ে

ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪৯:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫ ১৭৫ বার পড়া হয়েছে

ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বহু মানুষের জীবনের হিসাব যেন নদীর খাতায় মুছে যাচ্ছে একে একে।
যমুনা যখন ক্ষমাহীন, তখন শাহজাদপুরের মানুষ শুধু প্রার্থনা করছে,
নদী যদি নেয়, তবে একদিন ফেরতও দিক-এক টুকরো ভিটে, একটুখানি জীবন।

যমুনার পাড়ের মানুষের মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন, কবে থামবে এই ক্ষমা না জানা নদীর ভাঙন?

 

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা

অসময়ের যমুনা  যেন এক উন্মত্ত জন্তুর মতো। বর্ষা-শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত এলেও শান্ত হয়নি তার প্রবল স্রোত, থামেনি ভয়াবহ ভাঙন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে প্রতিদিন যমুনার খেয়ালি ঢেউ গিলে নিচ্ছে জমি, ঘরবাড়ি, মানুষজনের আশ্রয় ও আশা।

চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই ভাঙন শুরু হয়। নদীর ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন শুষ্ক মৌসুমেও চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। এরই মধ্যে ৫০০-র বেশি বাড়িঘর, দুটি মসজিদ, দুটি মাদরাসা, একটি কবরস্থান এবং শ’ শ’ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ধীতপুর-কুরসি গ্রামের হাট-বাজারগুলোও অর্ধেক নদীর পেটে চলে গেছে।

যমুনার পাড় ঘেঁষে দাঁড়ালে দেখা যায়—যেখানে এক মাস আগেও ছিল ফসলের ক্ষেত আর মানুষের ঘরবাড়ি, এখন সেখানে অথৈ পানি।

ধীতপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার প্রামাণিক বললেন, আমরা ১৯৮৮ সাল থেকেই এই ভাঙন দেখছি। ১০-১২ বার ঘর তুলেছি, আবার যমুনা কেড়ে নিয়েছে। নদীর তীরে দিন কাটে ভয়ে, রাত কাটে আতঙ্কে।

স্থানীয় নারী চম্পা বেগম কণ্ঠরোধ করে বলেন, এই মাঠেই ছিল আমাদের ধান আর বাদামের ফসল। সব গেছে নদীর তলায়। এখন ভাঙনের শব্দ শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে।

ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ
ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ

সোনাতনী ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতি শামছুল হক জানান, শ্রীপুর থেকে বারপাখিয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ’ ঘরবাড়ি, দুটি মসজিদ ও দুটি মাদরাসা নদীতে চলে গেছে। মানুষ আজ দিশেহারা। ভাঙন ঠেকাতে এখানে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ ছাড়া উপায় নেই।

শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে এ দুটি ইউনিয়নের প্রায় ২৭০ হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে হারিয়েছে। শুধু গত কয়েক মাসেই ভাঙনে বিলীন হয়েছে ৭০ থেকে ১০০ হেক্টর আবাদি জমি। ফলে কৃষকের ক্ষতি অপূরণীয়। নদীর বিপরীত তীরে ৮০-৯০ হেক্টর চর জেগে উঠেছে, কিন্তু তা এখনো আবাদযোগ্য নয়।

তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে—যাতে তারা অন্তত পরের মৌসুমে আবার নতুন করে চাষ শুরু করতে পারে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, কুরসি-ধীতপুর ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জিও ব্যাগ ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছে।

তবুও যমুনার পাড়ের মানুষের মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন, কবে থামবে এই ক্ষমা না জানা নদীর ভাঙন? যেখানে একসময় শিশুরা খেলত, কৃষকরা ফসল তুলত, সেখানেই আজ গিলে খাচ্ছে নদী তাদের ভবিষ্যৎ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ

আপডেট সময় : ১১:৪৯:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫

বহু মানুষের জীবনের হিসাব যেন নদীর খাতায় মুছে যাচ্ছে একে একে।
যমুনা যখন ক্ষমাহীন, তখন শাহজাদপুরের মানুষ শুধু প্রার্থনা করছে,
নদী যদি নেয়, তবে একদিন ফেরতও দিক-এক টুকরো ভিটে, একটুখানি জীবন।

যমুনার পাড়ের মানুষের মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন, কবে থামবে এই ক্ষমা না জানা নদীর ভাঙন?

 

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা

অসময়ের যমুনা  যেন এক উন্মত্ত জন্তুর মতো। বর্ষা-শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত এলেও শান্ত হয়নি তার প্রবল স্রোত, থামেনি ভয়াবহ ভাঙন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে প্রতিদিন যমুনার খেয়ালি ঢেউ গিলে নিচ্ছে জমি, ঘরবাড়ি, মানুষজনের আশ্রয় ও আশা।

চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই ভাঙন শুরু হয়। নদীর ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন শুষ্ক মৌসুমেও চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। এরই মধ্যে ৫০০-র বেশি বাড়িঘর, দুটি মসজিদ, দুটি মাদরাসা, একটি কবরস্থান এবং শ’ শ’ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ধীতপুর-কুরসি গ্রামের হাট-বাজারগুলোও অর্ধেক নদীর পেটে চলে গেছে।

যমুনার পাড় ঘেঁষে দাঁড়ালে দেখা যায়—যেখানে এক মাস আগেও ছিল ফসলের ক্ষেত আর মানুষের ঘরবাড়ি, এখন সেখানে অথৈ পানি।

ধীতপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার প্রামাণিক বললেন, আমরা ১৯৮৮ সাল থেকেই এই ভাঙন দেখছি। ১০-১২ বার ঘর তুলেছি, আবার যমুনা কেড়ে নিয়েছে। নদীর তীরে দিন কাটে ভয়ে, রাত কাটে আতঙ্কে।

স্থানীয় নারী চম্পা বেগম কণ্ঠরোধ করে বলেন, এই মাঠেই ছিল আমাদের ধান আর বাদামের ফসল। সব গেছে নদীর তলায়। এখন ভাঙনের শব্দ শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে।

ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ
ক্ষ্যাপা যমুনার গ্রাস থেকে রক্ষায় শাহজাদপুরের ৯ গ্রামের মানুষ

সোনাতনী ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতি শামছুল হক জানান, শ্রীপুর থেকে বারপাখিয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ’ ঘরবাড়ি, দুটি মসজিদ ও দুটি মাদরাসা নদীতে চলে গেছে। মানুষ আজ দিশেহারা। ভাঙন ঠেকাতে এখানে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ ছাড়া উপায় নেই।

শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে এ দুটি ইউনিয়নের প্রায় ২৭০ হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে হারিয়েছে। শুধু গত কয়েক মাসেই ভাঙনে বিলীন হয়েছে ৭০ থেকে ১০০ হেক্টর আবাদি জমি। ফলে কৃষকের ক্ষতি অপূরণীয়। নদীর বিপরীত তীরে ৮০-৯০ হেক্টর চর জেগে উঠেছে, কিন্তু তা এখনো আবাদযোগ্য নয়।

তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে—যাতে তারা অন্তত পরের মৌসুমে আবার নতুন করে চাষ শুরু করতে পারে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, কুরসি-ধীতপুর ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জিও ব্যাগ ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছে।

তবুও যমুনার পাড়ের মানুষের মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন, কবে থামবে এই ক্ষমা না জানা নদীর ভাঙন? যেখানে একসময় শিশুরা খেলত, কৃষকরা ফসল তুলত, সেখানেই আজ গিলে খাচ্ছে নদী তাদের ভবিষ্যৎ।