ঢাকা ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সমর্থন করে: তৌহিদ হোসেন প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচার চাইলে গণতান্ত্রিক সরকার অপরিহার্য, তারেক রহমান গোপালগঞ্জ-৩: প্রার্থিতা ফিরে পেলেন হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামানিক কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর ৫৬ পর্যবেক্ষক মোতায়েন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে  এখনই অতি সতর্কতার প্রয়োজন নেই: ইইউ ইরান ভেনেজুয়েলা নয়: ট্রাম্পের জন্য সহজ নয় জয়ের পথ গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে তারেক রহমান, মানবিক আবেগে ভরা মতবিনিময় সভা খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল: ডা. এফ এম সিদ্দিকীর গুরুতর অভিযোগ কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ: রংপুরে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমাবেশ ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস: ঋণ-বিবাদে নৃশংসভাবে খুন মা ও কিশোরী মেয়ে

‘কেন আমি রাজনীতিতে এলাম’ : গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার এমপি (পর্ব ২)

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৫৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জুন ২০২৩ ৪৩১ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

এই তল্লাটে উর্বর মাটি আর মানুষের সহাবস্থান, ভ্রাতৃত্ববোধের নজির হাজার বছরের। এই বাংলাদেশে যারাই এসেছেন, তারা মুগ্ধ ও তৃপ্ত মনে ফিরে গেছেন। হয়তো তাদের বহুদিন বাংলার মানুষের আতিথেয়তা মনকে নাড়া দেবে। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই মন্ত্র শিখিয়ে গিয়েছেন জাতির পিতা। তাঁরই শিখানো মন্ত্রেই  দীক্ষিত বাংলার মানুষ। বঙ্গবন্ধুর শেখানো শিষ্টাচার মানুষে মানুষে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্র প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। আমরা তার দেখানো পথেই হাটছি। তাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু’ । আজ আমরা সহজেই বলতে পারি, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু, পা বাড়ালেই পথ’। ‘বঙ্গবন্ধুর দেওয়া পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে শান্তি ও সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন

দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যুদ্ধকালীন প্রায় এককোটি মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতি, বিশেষ করে কূটনৈতিক গতিপথ নিয়ে বাংলাদেশ ছিল সবার আগ্রহের।  বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। সেই দেশটিই কিনা আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার করেছিল। এই বিষয়টিকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত নীতির প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা হতে দেননি।

নবাগত স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র নায়ক আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে ঘোষণা দিলেন, বাংলাদেশ হবে সবার বন্ধু। পৃথিবীর মানচিত্রের লালসবুজে খচিত পতাকার নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্র নয়ক বনঙ্গবন্ধুর এমন বার্তা বিশ্ববাসীকে অভিভূত করল। হিমালয়সম বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটল বিশ্বাসীর। এই ঘোষণা থেকেই গৃহীত হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার এক উজ্জল তারকা হয়ে থাকলেন বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান।

একদেশ হলেও পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি শাষকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নীপিড়ন চরমসীমা লঙ্ঘন করে। এই অবস্থায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি শেখ মুজিবুর রহমান। অসহায় মানুষের দুঃখ-দুর্শদশা দেখে নীরবে বসে থাকার জন্য জন্ম হয়নি শেখ মুজিবুর রহমানের । বাংলার  অসহায়, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে বছরের পর বছর আন্দোলন, সংগ্রাম ও কারাবরণ করেছেন।  অবর্ণনীয় নির্যাতন, জেল, জুলুম, অত্যাচার হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন।   ভীত সন্ত্রস্ত শাষকগোষ্ঠী যতবারই তাকে আঘাত করেছে, ততবারই জ্বলে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু। বঞ্চিত মানুষের জন্য তার এই ত্যাগ তাঁকে বাঙালি জাতির মুক্তির দূতে পরিণত করে। সে কারণেই তিনি হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান থেকে ‘বঙ্গের বন্ধু তথা বঙ্গবন্ধু’। আগাগোড়া শান্তিকামী একজন মানুষের ব্যক্তিজীবন, আদর্শ ও দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জুলিও কুরি পতক তুলে দেওয়া হচ্ছে

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। পাকিস্তানের  কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরেই শুরু করেন পুনর্গঠনের কাজ। তার সঙ্গী হলো বাংলার লাখো মানুষ। তারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশের উন্নয়নে ঝাপিয়ে পড়েন। বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সকল কিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারেনি। ধ্বংস স্তুপে দাঁড়িয়েই ঘোষণা দিলেন সোনার বাংলার প্রতিষ্ঠার। সে অনুযায়ী বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো, কলকারখানা চালু করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার, রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ, কৃষকদের সহযোগিতায় হাত বাড়ালেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বহির্বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাই তিনি বিশ্বের সকল দেশের কাছে পাঠালেন শান্তির বার্তা।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ তাকে ‘জুলিও কুরি পদকে’ ভূষিত।

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবনভর আন্দোলন ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ তাকে ‘জুলিও কুরি পদকে’ ভূষিত করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা ছিল এই পদক। জুলিও কুরি সম্মাননা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যারা আগে স্বীকৃতি দেয়নি, তারাও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে  ফিরে আসার   ১০ মাস পর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্বের ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জুলিও কুরি পদক’-এ সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদক প্রদান করে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বশান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র বঙ্গবন্ধুকে এ পদক হস্তান্তর করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।’ এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শান্তিপ্রিয়তার বার্তা পৌঁছে যায় বিশ্বের দরবারে। এই বিরল সম্মাননা বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের। বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তি জাতিসংঘসহ বহু আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তির ৫০ বছর পরও বিশ্বশান্তির প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু সমান প্রাসঙ্গিক। এসব কথা আজ ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে।

বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুই ছাড়াও অন্যান্য যারা এই পদক লাভ করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, ফিদেল কাস্ত্রো, সালভেদর আলেন্দে, নেলসন ম্যান্ডেলা, মাদার তেরেসা, কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, মার্টিন লুথার কিং, লিওনিদ ব্রেজনেভ, ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত, ভিয়েতনামের সংগ্রামী নেতা হো চি মিন প্রমুখ। চলবে

পরবর্তি : ‘বঙ্গবন্ধুর পর শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা’ (পর্ব ৩)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

‘কেন আমি রাজনীতিতে এলাম’ : গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার এমপি (পর্ব ২)

আপডেট সময় : ১০:৫৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জুন ২০২৩

 

এই তল্লাটে উর্বর মাটি আর মানুষের সহাবস্থান, ভ্রাতৃত্ববোধের নজির হাজার বছরের। এই বাংলাদেশে যারাই এসেছেন, তারা মুগ্ধ ও তৃপ্ত মনে ফিরে গেছেন। হয়তো তাদের বহুদিন বাংলার মানুষের আতিথেয়তা মনকে নাড়া দেবে। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই মন্ত্র শিখিয়ে গিয়েছেন জাতির পিতা। তাঁরই শিখানো মন্ত্রেই  দীক্ষিত বাংলার মানুষ। বঙ্গবন্ধুর শেখানো শিষ্টাচার মানুষে মানুষে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্র প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। আমরা তার দেখানো পথেই হাটছি। তাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু’ । আজ আমরা সহজেই বলতে পারি, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু, পা বাড়ালেই পথ’। ‘বঙ্গবন্ধুর দেওয়া পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে শান্তি ও সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন

দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যুদ্ধকালীন প্রায় এককোটি মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতি, বিশেষ করে কূটনৈতিক গতিপথ নিয়ে বাংলাদেশ ছিল সবার আগ্রহের।  বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। সেই দেশটিই কিনা আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার করেছিল। এই বিষয়টিকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত নীতির প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা হতে দেননি।

নবাগত স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র নায়ক আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে ঘোষণা দিলেন, বাংলাদেশ হবে সবার বন্ধু। পৃথিবীর মানচিত্রের লালসবুজে খচিত পতাকার নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্র নয়ক বনঙ্গবন্ধুর এমন বার্তা বিশ্ববাসীকে অভিভূত করল। হিমালয়সম বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটল বিশ্বাসীর। এই ঘোষণা থেকেই গৃহীত হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার এক উজ্জল তারকা হয়ে থাকলেন বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান।

একদেশ হলেও পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি শাষকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নীপিড়ন চরমসীমা লঙ্ঘন করে। এই অবস্থায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি শেখ মুজিবুর রহমান। অসহায় মানুষের দুঃখ-দুর্শদশা দেখে নীরবে বসে থাকার জন্য জন্ম হয়নি শেখ মুজিবুর রহমানের । বাংলার  অসহায়, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে বছরের পর বছর আন্দোলন, সংগ্রাম ও কারাবরণ করেছেন।  অবর্ণনীয় নির্যাতন, জেল, জুলুম, অত্যাচার হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন।   ভীত সন্ত্রস্ত শাষকগোষ্ঠী যতবারই তাকে আঘাত করেছে, ততবারই জ্বলে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু। বঞ্চিত মানুষের জন্য তার এই ত্যাগ তাঁকে বাঙালি জাতির মুক্তির দূতে পরিণত করে। সে কারণেই তিনি হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান থেকে ‘বঙ্গের বন্ধু তথা বঙ্গবন্ধু’। আগাগোড়া শান্তিকামী একজন মানুষের ব্যক্তিজীবন, আদর্শ ও দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জুলিও কুরি পতক তুলে দেওয়া হচ্ছে

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। পাকিস্তানের  কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরেই শুরু করেন পুনর্গঠনের কাজ। তার সঙ্গী হলো বাংলার লাখো মানুষ। তারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশের উন্নয়নে ঝাপিয়ে পড়েন। বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সকল কিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারেনি। ধ্বংস স্তুপে দাঁড়িয়েই ঘোষণা দিলেন সোনার বাংলার প্রতিষ্ঠার। সে অনুযায়ী বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো, কলকারখানা চালু করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার, রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ, কৃষকদের সহযোগিতায় হাত বাড়ালেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বহির্বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাই তিনি বিশ্বের সকল দেশের কাছে পাঠালেন শান্তির বার্তা।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ তাকে ‘জুলিও কুরি পদকে’ ভূষিত।

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবনভর আন্দোলন ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ তাকে ‘জুলিও কুরি পদকে’ ভূষিত করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা ছিল এই পদক। জুলিও কুরি সম্মাননা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যারা আগে স্বীকৃতি দেয়নি, তারাও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে  ফিরে আসার   ১০ মাস পর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্বের ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জুলিও কুরি পদক’-এ সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদক প্রদান করে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বশান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র বঙ্গবন্ধুকে এ পদক হস্তান্তর করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।’ এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শান্তিপ্রিয়তার বার্তা পৌঁছে যায় বিশ্বের দরবারে। এই বিরল সম্মাননা বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের। বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তি জাতিসংঘসহ বহু আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তির ৫০ বছর পরও বিশ্বশান্তির প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু সমান প্রাসঙ্গিক। এসব কথা আজ ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে।

বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুই ছাড়াও অন্যান্য যারা এই পদক লাভ করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, ফিদেল কাস্ত্রো, সালভেদর আলেন্দে, নেলসন ম্যান্ডেলা, মাদার তেরেসা, কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, মার্টিন লুথার কিং, লিওনিদ ব্রেজনেভ, ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত, ভিয়েতনামের সংগ্রামী নেতা হো চি মিন প্রমুখ। চলবে

পরবর্তি : ‘বঙ্গবন্ধুর পর শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা’ (পর্ব ৩)