ঢাকা ০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সমর্থন করে: তৌহিদ হোসেন প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচার চাইলে গণতান্ত্রিক সরকার অপরিহার্য, তারেক রহমান গোপালগঞ্জ-৩: প্রার্থিতা ফিরে পেলেন হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামানিক কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর ৫৬ পর্যবেক্ষক মোতায়েন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে  এখনই অতি সতর্কতার প্রয়োজন নেই: ইইউ ইরান ভেনেজুয়েলা নয়: ট্রাম্পের জন্য সহজ নয় জয়ের পথ গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে তারেক রহমান, মানবিক আবেগে ভরা মতবিনিময় সভা খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল: ডা. এফ এম সিদ্দিকীর গুরুতর অভিযোগ কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ: রংপুরে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমাবেশ ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস: ঋণ-বিবাদে নৃশংসভাবে খুন মা ও কিশোরী মেয়ে

Folk Hero : ‘লোকনায়ক’

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ ৫২৩ বার পড়া হয়েছে

পশ্চিমবঙ্গের লোকসঙ্গীত গবেষক ও শিল্পী অরুণ চক্রবর্তী

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘কিংবদন্তি এমন ঘটনা বা চরিত্র থেকে উদ্ভূত হয় যা লোকনায়ক ভিত্তিক। সাধারণত কোন অঞ্চলে চরিত্রকেন্দ্রিক কাহিনি, যা সেই অঞ্চলের মানুষ মুখে মুখে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। তথ্য-উপাথ্য বলছে, ‘লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত হল কিংবদন্তি’। ইংরেজী ভাষায় লিজেন্ড, লোকাল ট্রাডিশন এবং আরও অন্যান্য আঞ্চলিক সংজ্ঞায় অভিহিত করা হয়। বাংলায় সাধারণভাবে কিংবদন্তি বলা হয়। লিখছেন অনিরুদ্ধ’

হেমন্তের শিশির স্নাত সকাল। কলকাতায় শীত ঝাকিয়ে না বসলেও কুয়াশা পরেছে। নভেম্বর মাসের শেষ রাতে শীত অনুভূত হয়। শীত মানেইতো বাঙালির মুখোরোচক নানা খাবারের আয়োজন। সামর্থবানদের ঘরে আয়েশি সব আয়োজনের ডামাঢোল। সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌছাতে হবে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। সেখানে রয়েছেন লোকনায়ক। তার সঙ্গেই আজ বোঝাপড়া। আবাল-বৃদ্ধ বণিতা সবাই তার ভক্ত। সেই মানুষটির সঙ্গে আমার দারুণ ভাব না থাকলেও আত্মার একটা সম্পর্ক রয়েছে। তাকে নিয়ে একটা কিছু করতে হবে। এই ইচ্ছে থেকেই তার বাড়ি অব্দি ছুটে যাওয়া।

সস্ত্রীক অরুণ চক্রবর্তী

বারান্দায় বসেই কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। কিছুক্ষণ পর মুখে স্মিত হাসি নিয়ে হাজির হলেন মধ্য বয়স্ক এক নারী। কথায় কথায় স্মৃতির জানালা খুলে দিলেন। সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে। নতুন বউ, জীবন ঘিরে কত স্বপ্ন। সিনেমা দেখা, ফুচকার দোকানে বসে কথায় কথায় হারিয়ে যাওয়া, কড়া শব্দ করে স্টেশন ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেন দেখা ইত্যাদি। এসব আনকোড়া সংসার জীবনের চিত্রকল্প। কিন্তু না, এসব ভাবনায় গা ভাসাতে পারেননি এই নারী। রাতের পর রাত কাটিয়েছেন একা ঘরে। মনে হয়েছে সবই শূন্য। নতুন বউয়ের আকাঙ্খা, একটু ভালোবাসা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। কোথায় গেল মানুষটা, ঠিক আছো! কবে ফিরবে? শূণ্যঘরে মনপ্রাণ দিয়ে মানুষটির কল্যাণ কামনা করেন, আর ভাবেন সেখানেই যাক-সশরীরে ফিরে আসুক মানুষটা। ঘরে নতুন বউ রেখে কোথায় গেলো মানুষটা! একসপ্তাহ পার হল, অথচ তার কোন হদিস নেই।

এক সময় লজ্জার মাথা খেয়ে শশুড়কে খোঁজ নিতে আকুতি জানান। বাবা বুঝতে পারেন নতুন বউটির মনের আকুতি। কিন্তু ছেলে যে বাউল মেলায় গিয়ে ভাবজগতে হারিয়ে গিয়েছে। আদিবাসী ও বাউলদের সঙ্গে নাচগানে মত্ত থাকে ইঞ্জিনিয়ার ছেলে। ছেলের এমন কাণ্ডকারখানায় আশঙ্কা বাড়ে নববধূর। আঁচলে মুখ ঢেকে থাকে সারাক্ষণ। বাবা-মা ভাবেন মেয়েটাকে এমনি ফেলে রেখে কোথায় গিয়ে ডুব দিলে ছেলেটা। ছেলে বউয়ের সঙ্গে বাবা-মারও চিন্তা বাড়ে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম সে কথা। এক সময় স্মৃতির জানালা ছেড়ে ফিরে আসেন ভদ্র মহিলা। বললেন চা দিচ্ছি। এমন সময় অট্টহাসিতে ঘর ভরিয়ে দিলেন সেই ভাবজগতের বাসিন্দা। বললেন, বুঝলে জীবনে এসব না থাকলে, সৃষ্টি আসবে কোথা থেকে?

আগের দিনেই কথা হয়ে গিয়েছিল, সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌছাতে হবে। নতুবা তাকে পাওয়া যাবে না। তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক সময় মতোই ট্যাক্সি এসে থামলো কলকাতা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর সামনে। উল্টো দিকে মোহরকুঞ্জ। প্রাতভ্রমণে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। তাদের মধ্যে প্রবীণদের সংখ্যা বেশি। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে মোহরকুঞ্জকে দেখলাম। কত প্রকারের গাছ আছে এখানে জানিনা। মনে হল কলকাতা শহরে ফুসফুস মোহরকুঞ্জ। রাতের ক্লান্তি উড়ে গিয়ে মনটা সজিবতায় ভরে ওঠলো।

গেল রাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস মঞ্চে মনীশ মিত্রের ইতিহাস ভিত্তিক নাটক ‘ঊরুভঙ্গম’ মনস্থ হয়েছে। তা দেখতেই এখানে এসছেন ক্ষ্যাপা। নাটকটি চলে রাতভর। অর্থাৎ রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত। ইতিহাসের পাতায় ঘুরে যতটুকু জানা যায় তা হচ্ছে, মহাকবি ভাসের লেখা বিখ্যাত নাটক ‘ঊরুভঙ্গম’। কালিদাস-পূর্ববর্তী যুগের নাট্যকার কবিকুলহাস্ ভাস, যার প্রশস্তি মেলে কালিদাসের লেখাতেও। মহাভারতের শল্যপর্বের একেবারে শেষের দিকে দ্বৈপায়ন হ্রদের পাশে ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরু ভেঙে দিয়েছিল মধ্যম পাণ্ডব। ভাঙা ঊরু নিয়ে রক্তাক্ত, হতমান দুর্যোধনের মৃত্যুর সঙ্গেই এক অর্থে শেষ হয় আঠারো দিনের কুরু-পাণ্ডবের আত্মঘাতী যুদ্ধ। কৌরবদের শোচনীয় পরাজয়ের সেই অধ্যায়টিকে নিয়েই প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল ‘ঊরুভঙ্গম’ নাটকটি।

ঘড়ি কাটার সঙ্গে হাটছি। একটু আগেই শেষ হয়েছে নাটক। ভেতর থেকে নারী-পুরুষ পাশাপাশি হেটে বের হচ্ছেন। তারা বেড়িয়ে এসেও গেল রাতের নাটক নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে পথ চলছেন। আবার অনেকে যার যার বাড়ি ফিরছেন। রাতজাগা মানুষের অনেকেই বাইরে বেড়িয়ে এসে চায়ের দোকানে জটলা করছেন। গরম গরম চায়ে চুমক দিয়ে শরীর ঝাকিয়ে নিচ্ছেন। তারা মধ্যে একজন মানুষ একটু ব্যতিক্রম। গাছতলায় বসে চায়ের পেলায় চুমক দিয়ে গতরাতের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। আর মাঝে মাঝে চায়ে চুমক দিয়ে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছেন।

কলকাতা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস চত্বরে উদাস বাউল অরুণ চক্রবর্তী

অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর দেওয়াল ঘেঁষে বেশ কয়েকটি চায়ের দোকান। সার সার গাছের গোড়াটা গোল করে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাঁধানো। সেখানে বসেই চায়ের পেয়ালায় চুমক দিচ্ছেন লোকনায়ক। দূর থেকে দেখা গেল মাথায় রঙিন রুমাল বাধা সুঠাম দেহী একজন মানুষ, শুশ্রুমণ্ডিত। চলনে-বলনে তারুণ্যের ছোঁয়া। চিন্তাচেতনায় আধুনিক। তাকে চিনে নিতে কষ্ট হয়নি। কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেই বসা থেকে ওঠে জড়িয়ে ধরলেন। তার সঙ্গীকে বললেন দেখেছো, একদম রাইট টাইমে পৌঁছে গিয়েছে ও। তাকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে। অনেকটা চিৎকারের সুরেই বললেন চা দিতে।  সঠিক সময়ে পৌছে যাওয়ার কথা বার বার উচ্ছারণ করেন ‘লাল পাহাড়ের দেশে যা রাঙ্গামটির দেশে যা, ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে, ইক্কেবারে মানাইছে না রে’ গানের গীতিকার পশ্চিমবঙ্গের কিংবদন্তি লোকসঙ্গীত গবেষক ও শিল্পী অরুণ চক্রবর্তী।

(চলবে)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

Folk Hero : ‘লোকনায়ক’

আপডেট সময় : ০৮:১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২২

‘কিংবদন্তি এমন ঘটনা বা চরিত্র থেকে উদ্ভূত হয় যা লোকনায়ক ভিত্তিক। সাধারণত কোন অঞ্চলে চরিত্রকেন্দ্রিক কাহিনি, যা সেই অঞ্চলের মানুষ মুখে মুখে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। তথ্য-উপাথ্য বলছে, ‘লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত হল কিংবদন্তি’। ইংরেজী ভাষায় লিজেন্ড, লোকাল ট্রাডিশন এবং আরও অন্যান্য আঞ্চলিক সংজ্ঞায় অভিহিত করা হয়। বাংলায় সাধারণভাবে কিংবদন্তি বলা হয়। লিখছেন অনিরুদ্ধ’

হেমন্তের শিশির স্নাত সকাল। কলকাতায় শীত ঝাকিয়ে না বসলেও কুয়াশা পরেছে। নভেম্বর মাসের শেষ রাতে শীত অনুভূত হয়। শীত মানেইতো বাঙালির মুখোরোচক নানা খাবারের আয়োজন। সামর্থবানদের ঘরে আয়েশি সব আয়োজনের ডামাঢোল। সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌছাতে হবে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। সেখানে রয়েছেন লোকনায়ক। তার সঙ্গেই আজ বোঝাপড়া। আবাল-বৃদ্ধ বণিতা সবাই তার ভক্ত। সেই মানুষটির সঙ্গে আমার দারুণ ভাব না থাকলেও আত্মার একটা সম্পর্ক রয়েছে। তাকে নিয়ে একটা কিছু করতে হবে। এই ইচ্ছে থেকেই তার বাড়ি অব্দি ছুটে যাওয়া।

সস্ত্রীক অরুণ চক্রবর্তী

বারান্দায় বসেই কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। কিছুক্ষণ পর মুখে স্মিত হাসি নিয়ে হাজির হলেন মধ্য বয়স্ক এক নারী। কথায় কথায় স্মৃতির জানালা খুলে দিলেন। সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে। নতুন বউ, জীবন ঘিরে কত স্বপ্ন। সিনেমা দেখা, ফুচকার দোকানে বসে কথায় কথায় হারিয়ে যাওয়া, কড়া শব্দ করে স্টেশন ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেন দেখা ইত্যাদি। এসব আনকোড়া সংসার জীবনের চিত্রকল্প। কিন্তু না, এসব ভাবনায় গা ভাসাতে পারেননি এই নারী। রাতের পর রাত কাটিয়েছেন একা ঘরে। মনে হয়েছে সবই শূন্য। নতুন বউয়ের আকাঙ্খা, একটু ভালোবাসা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। কোথায় গেল মানুষটা, ঠিক আছো! কবে ফিরবে? শূণ্যঘরে মনপ্রাণ দিয়ে মানুষটির কল্যাণ কামনা করেন, আর ভাবেন সেখানেই যাক-সশরীরে ফিরে আসুক মানুষটা। ঘরে নতুন বউ রেখে কোথায় গেলো মানুষটা! একসপ্তাহ পার হল, অথচ তার কোন হদিস নেই।

এক সময় লজ্জার মাথা খেয়ে শশুড়কে খোঁজ নিতে আকুতি জানান। বাবা বুঝতে পারেন নতুন বউটির মনের আকুতি। কিন্তু ছেলে যে বাউল মেলায় গিয়ে ভাবজগতে হারিয়ে গিয়েছে। আদিবাসী ও বাউলদের সঙ্গে নাচগানে মত্ত থাকে ইঞ্জিনিয়ার ছেলে। ছেলের এমন কাণ্ডকারখানায় আশঙ্কা বাড়ে নববধূর। আঁচলে মুখ ঢেকে থাকে সারাক্ষণ। বাবা-মা ভাবেন মেয়েটাকে এমনি ফেলে রেখে কোথায় গিয়ে ডুব দিলে ছেলেটা। ছেলে বউয়ের সঙ্গে বাবা-মারও চিন্তা বাড়ে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম সে কথা। এক সময় স্মৃতির জানালা ছেড়ে ফিরে আসেন ভদ্র মহিলা। বললেন চা দিচ্ছি। এমন সময় অট্টহাসিতে ঘর ভরিয়ে দিলেন সেই ভাবজগতের বাসিন্দা। বললেন, বুঝলে জীবনে এসব না থাকলে, সৃষ্টি আসবে কোথা থেকে?

আগের দিনেই কথা হয়ে গিয়েছিল, সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌছাতে হবে। নতুবা তাকে পাওয়া যাবে না। তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক সময় মতোই ট্যাক্সি এসে থামলো কলকাতা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর সামনে। উল্টো দিকে মোহরকুঞ্জ। প্রাতভ্রমণে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। তাদের মধ্যে প্রবীণদের সংখ্যা বেশি। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে মোহরকুঞ্জকে দেখলাম। কত প্রকারের গাছ আছে এখানে জানিনা। মনে হল কলকাতা শহরে ফুসফুস মোহরকুঞ্জ। রাতের ক্লান্তি উড়ে গিয়ে মনটা সজিবতায় ভরে ওঠলো।

গেল রাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস মঞ্চে মনীশ মিত্রের ইতিহাস ভিত্তিক নাটক ‘ঊরুভঙ্গম’ মনস্থ হয়েছে। তা দেখতেই এখানে এসছেন ক্ষ্যাপা। নাটকটি চলে রাতভর। অর্থাৎ রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত। ইতিহাসের পাতায় ঘুরে যতটুকু জানা যায় তা হচ্ছে, মহাকবি ভাসের লেখা বিখ্যাত নাটক ‘ঊরুভঙ্গম’। কালিদাস-পূর্ববর্তী যুগের নাট্যকার কবিকুলহাস্ ভাস, যার প্রশস্তি মেলে কালিদাসের লেখাতেও। মহাভারতের শল্যপর্বের একেবারে শেষের দিকে দ্বৈপায়ন হ্রদের পাশে ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরু ভেঙে দিয়েছিল মধ্যম পাণ্ডব। ভাঙা ঊরু নিয়ে রক্তাক্ত, হতমান দুর্যোধনের মৃত্যুর সঙ্গেই এক অর্থে শেষ হয় আঠারো দিনের কুরু-পাণ্ডবের আত্মঘাতী যুদ্ধ। কৌরবদের শোচনীয় পরাজয়ের সেই অধ্যায়টিকে নিয়েই প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল ‘ঊরুভঙ্গম’ নাটকটি।

ঘড়ি কাটার সঙ্গে হাটছি। একটু আগেই শেষ হয়েছে নাটক। ভেতর থেকে নারী-পুরুষ পাশাপাশি হেটে বের হচ্ছেন। তারা বেড়িয়ে এসেও গেল রাতের নাটক নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে পথ চলছেন। আবার অনেকে যার যার বাড়ি ফিরছেন। রাতজাগা মানুষের অনেকেই বাইরে বেড়িয়ে এসে চায়ের দোকানে জটলা করছেন। গরম গরম চায়ে চুমক দিয়ে শরীর ঝাকিয়ে নিচ্ছেন। তারা মধ্যে একজন মানুষ একটু ব্যতিক্রম। গাছতলায় বসে চায়ের পেলায় চুমক দিয়ে গতরাতের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। আর মাঝে মাঝে চায়ে চুমক দিয়ে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছেন।

কলকাতা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস চত্বরে উদাস বাউল অরুণ চক্রবর্তী

অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর দেওয়াল ঘেঁষে বেশ কয়েকটি চায়ের দোকান। সার সার গাছের গোড়াটা গোল করে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাঁধানো। সেখানে বসেই চায়ের পেয়ালায় চুমক দিচ্ছেন লোকনায়ক। দূর থেকে দেখা গেল মাথায় রঙিন রুমাল বাধা সুঠাম দেহী একজন মানুষ, শুশ্রুমণ্ডিত। চলনে-বলনে তারুণ্যের ছোঁয়া। চিন্তাচেতনায় আধুনিক। তাকে চিনে নিতে কষ্ট হয়নি। কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেই বসা থেকে ওঠে জড়িয়ে ধরলেন। তার সঙ্গীকে বললেন দেখেছো, একদম রাইট টাইমে পৌঁছে গিয়েছে ও। তাকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে। অনেকটা চিৎকারের সুরেই বললেন চা দিতে।  সঠিক সময়ে পৌছে যাওয়ার কথা বার বার উচ্ছারণ করেন ‘লাল পাহাড়ের দেশে যা রাঙ্গামটির দেশে যা, ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে, ইক্কেবারে মানাইছে না রে’ গানের গীতিকার পশ্চিমবঙ্গের কিংবদন্তি লোকসঙ্গীত গবেষক ও শিল্পী অরুণ চক্রবর্তী।

(চলবে)