Bangladesh of harmony : সম্প্রীতির বাংলাদেশ : শারদ উৎসবে মাতোয়ারা বাঙালি
- আপডেট সময় : ০৭:৪০:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ ৩২১ বার পড়া হয়েছে
জেসমিন বন্যা
আবহমান কাল থেকেই বাঙালি শিল্প-সংস্কৃতি ও কৃষ্টিতে বিশ্বাসী। সকল ধর্মের সহাবস্থান যুগ যুগ ধরে পথ দেখিয়েছে। যে কোন পার্বনে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ। সার্বজনীন পূজা বা ঈদ উভয়ই উৎসব। সবাই মিলেমিশে একাকার। এমন নজির গড়া সাংস্কৃতির মেলবন্ধন বাঙলা ছাড়া আর কোথাও আছে বলে জানা নেই।
বিভিষিকার দুই বছর পর শারদীয় উৎসবে সনাতনধর্মাবলম্বী মানুষ বন্দী দশা থেকে মুক্ত। এবারেই কোন বিধিনিষেধ ছাড়া দুর্গোৎসব পালন করা হল। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে চার দিনের মিলন মেলা শেষ হলো। ফের একটি বছর মায়ের জন্য অপেক্ষার পালা।
শারদীয় উৎসবের প্রস্তুতি পর্বে কর্তাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে গিয়েছিলাম। তখনই শুনেছি শারদের স্নিগ্ধ আকাশে মায়ের আগমনী সুর। ঢাকার আয়োজনের বিশালতায় মুগদ্ধ হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে পূজার সংখ্যা বেশি। এবছর ৩২ হাজার ১৬৮টি মন্দির-মণ্ডপে দুর্গোৎসব উদযাপন হয়েছে।
আর হবেই না কেন বলুন? এ যে সম্প্রীতির বাংলাদেশ। শৈশব থেকে দেখেছি কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে যুগের পর যুগ বাঙালির একসঙ্গে বসবাস। কত মণিঋষিরা এসেছেন এই বাঙলায়। তারা সাম্যের বাণী শুনিয়েছে। পরস্পর পরস্পরে সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলেছেন। তাদের দেখানো পথে গতিশীল হয়েছে বাংলার সাংস্কৃতি। ঢাকেশ্বরীর বেলতলার পাশে দাঁড়িয়ে দেখা গেল পূজার আয়োজন চলছে মহাসমারোহে। মানুষের সেকি ব্যস্ততা।
এ অবস্থায় মন ছুটে যায় আমার শৈশবের শহর দক্ষিণবাংলার নদী বিধৌত ছোট্ট শহর ঝালকাঠি। দ্বিতীয় কলকাতাখ্যাত চিল ঝালকাঠী। পূজোয় সেজে ওঠে ঝালকাঠি। কেবল মণ্ডপ নয়, গোটা শহরে আলোকসজ্জা। সহপাঠিদের মাঝে সে কি উন্মাদনা। মণ্ডপে মণ্ডপে বসতো ভক্তিমুলক গান আসর। পুজো হবে মেলা হবে না? তা কি করে হয়। পুজোর মেলা থেকে নকুল, বাতাসা, কদমা, খুরমা, গজা , কত্ত কিছু কিনতাম। সঙ্গে নিতাম মাটির পুতুল, হাড়ি ঢাকনা বাঘ হাতি ঘোড়া কত কি!
বাবাই বিকেল বেলা নিয়ে মেলায় যেতেন। পছন্দের নানা জিনিষ কিনে দিতেন। তারপর মন্দিরে মন্দিরে ঘুরিয়ে দেখাতেন। একবার কালী মন্দিরের সামনে আমি আর গালিভ এবং বাবা এক সঙ্গে। বাবা তার কলিক বা ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। আমিতো ভয়ে অস্থির! হঠাৎ দেখি অন্ধকারে কালীমাতার জিহ্বা জ্বলছে। তা দেখে গালিভকে জড়িয়ে ধরে বাবা বলে চিৎকার দিয়ে ওঠি। আর তখনই হ্যাজাক লাইট জ্বলে উঠেছিল। আমায় কোলে করে বাসায় চলে। সেই থেকে কালিমন্দিরের সামনে দিয়ে যেতে ভয় পেতাম।
আর একটি স্মৃতি খুব মনে পড়ে। একবার আখ কিনতে গিয়েছিলাম। বাবা ছাড়া সাথে ছিল সেজ খালু। আমাদের ডিপো খেয়াঘাট থেকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমরা কিছু একটা দেখতে পেয়ে দাড়িয়ে যাই। অনেক্ষন পর মনে পড়ল বাবা কোথায়? অনেকক্ষন খোজাখুজি করে পাচ্ছি না। আমাদের খেলা দেখছি, সেই ফাঁকে বাবা নামাজে গিয়েছেন। এরই মধ্যে আমরা কান্নাকাটি করে পৌর সভা খেয়াঘাটে চলে গেলাম। এলাকার এক ভাই ইউনুস কাছে ডেকে বললেন এসো কিছু খাবে। এরমধ্যে স্যার না আসলে বাসায় পৌছে দেব। এর মধ্যেই রিক্সা করে বাবাকে যেতে দেখে ইউনুস ভাই স্যার বলে ডাকলেন। অমনি বাবা লাফ দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।

শারদীয় উৎসব এলেই এমনি অনেক স্মৃতি ভর করে। ভাসানের দিন আরতি দির বাসায় যেতাম সবাইকে দাদাবাবু প্রনামী দিত। তারপর চুসী, পিঠা, বড়া পিঠা ও নাড়ু খেতাম। লক্ষী পুজোর পর বাড়িতে বাড়িতে দাওয়াত। সবাই মিলে নাড়ু মোয়া নিমকী লুচী সন্দেশ খেতাম। একবার বাসন্তীর বাড়ী বৃষ্টির জন্য যেতে পারিনি, কিন্তু বাসু সেই জলকাদাঁ পেরিয়ে ঠিকই হরেক রকম নাড়ু, মোয়া, নকুল, বাতাসা, লুচী আর সন্দেশ নিয়ে হাজির। সঙ্গে উপহার পেলাম একঝুলি বকা।
এই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা বকা শুনে আমি দূরে দাড়িয়ে হাসছি। মা বাসুকে বলছে, এখন তো রাত হয়ে গেছে, তুমি এই বৃষ্টি কাদায় যাবে কেমন করে। পরে মাই ভাই ও খালাতো দুই ভাই পাঠালো বিটুকে বাড়ি পৌছে দিতে। কতরকম মাছ দিয়ে অষ্টমীর খাওয়া। এই সব সুখ স্মৃতি গুলো একদম ঝকঝকে। কোনদিন কোন আড্ডায় কোন কথা হয়েছে, তা নিয়ে চরম হাসাহাসি ঠাট্টায় মেতে ওঠেছি। আশ্বিনের দিন কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে বলতেই পারবো না। বাড়ির পথে পা বাড়িয়েও মনটা পড়ে থাকতো বন্ধুর দোতালার ঐ বসার ঘরটায়।
লেখক : জেসমিন বন্যা, সহকারী অধ্যাপক, সাটুরিয়া সৈয়দ কালু শাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ























