ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে মূল্যস্ফীতির চাপ ও দারিদ্র্য কমার আশা: বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ
- আপডেট সময় : ০৩:২৩:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১১০ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষকে পুনরায় দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করার পাশাপাশি নতুন করে মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকেও সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আজ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন।
এর আগে সকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে আরও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে এসব কর্মসূচির অন্যতম দুর্বলতা ছিল উপকারভোগী বাছাইয়ে ত্রুটি। ফলে প্রকৃত সহায়তাপ্রত্যাশী অনেকেই তালিকার বাইরে থেকে গেছেন, অন্যদিকে অনুপযুক্ত ব্যক্তিরাও সুবিধাভোগীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এ সমস্যা দূর করতে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের শনাক্ত করে তাঁদের কাছে যথাযথভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
ড. তিতুমীর আরও বলেন, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের এসব উদ্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন বা কল্পনানির্ভর পরিকল্পনা নয়; বরং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, এ ক্ষেত্রে রাজস্ব ও আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কারও অপরিহার্য। সরকারের অন্যতম লক্ষ্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অনিয়মের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
রাজস্ব প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে এ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, সংস্কার কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, বিভিন্ন পূর্বাভাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শর্ত, অনুমান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সে দৃষ্টিকোণ থেকেও আইএমএফের পূর্বাভাস মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অতীতে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে চায়।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়েও গুরুত্ব দেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ফলে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার কাজ করছে।
তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন। একই সঙ্গে অনেক আমানতকারী অর্থ জমাও রাখছেন, যা ব্যাংকটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের ইতিবাচক ইঙ্গিত। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাকেও আর্থিক খাতের পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, সংকটজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব করলেই অর্থনীতির ওপর এর সামগ্রিক প্রভাব পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা না থাকলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকার এর অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় কাজ করছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের কৌশল তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র এবং রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো। এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কুইন সিরিকিত জাতীয় সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং আর্থিক খাতের সংস্কার এবারের সভার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এ সম্মেলন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।









