জবানবন্দি গ্রহণে গুরুতর ত্রুটি ১৬ বছর পর উচ্চ আদালতের পদক্ষেপ
- আপডেট সময় : ১০:৩১:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। কয়েকটি আইনি আনুষ্ঠানিকতা। আর সেই প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মূল্য একজন মানুষের জীবনের ১৬টি বছর। পিরোজপুরের নূর মোহাম্মদকে ঘিরে উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায়টি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি নয়, এটি বিচারিক দায়িত্ব পালনে সামান্যতম গাফিলতি কিংবা আইনের বাধ্যতামূলক বিধানকে উপেক্ষা করার ভয়াবহ পরিণতিরও একটি দৃষ্টান্ত।
২০১০ সালে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া চৌকি আদালতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. কবির উদ্দিন প্রামাণিক। সেই সময় নূর মোহাম্মদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করা হয়।
কিন্তু প্রায় দেড় দশক পর মামলাটি উচ্চ আদালতে এসে যে চিত্র সামনে আসে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হাইকোর্ট দেখতে পায়, জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার বাধ্যতামূলক বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
আইন অনুযায়ী, একজন আসামির স্বীকারোক্তি নথিবদ্ধ করা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাজ নয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার ওপর একজন মানুষের স্বাধীনতা, এমনকি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নও নির্ভর করতে পারে।
তাই ম্যাজিস্ট্রেটকে নিশ্চিত করতে হয়, স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, আসামি তার বক্তব্যের পরিণতি সম্পর্কে অবগত কি না এবং আইন নির্ধারিত প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না।
কিন্তু নূর মোহাম্মদের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়াতেই গুরুতর ব্যত্যয় ঘটেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্ধারিত ফরমের ৫ নম্বর কলামে থাকা প্রশ্নগুলো আসামিকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর ৬ নম্বর কলামে তার উত্তর লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
সেখানে মাত্র তিনটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা হয়নি। এমনকি নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর না নিয়ে আলাদা পাতায় আসামির স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।
এখানেই প্রশ্ন আসে একজন বিচারকের জন্য এসব কি নিছক ‘ফরম পূরণের’ বিষয়? মোটেই নয়। আদালতই তো আইনের শেষ আশ্রয়স্থল। একজন বিচারক যখন কোনো আসামির স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন, তখন তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি উত্তর এবং প্রতিটি স্বাক্ষরের পেছনে আইনের সুরক্ষা কাজ করে। সেই সুরক্ষা ভেঙে গেলে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, নূর মোহাম্মদকে পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর কারাগারে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তাকে খালাস দিয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষকে ১৬ বছর এমন একটি দণ্ডের বোঝা বহন করতে হয়েছে, যার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিই উচ্চ আদালতের বিবেচনায় আইনসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
এখানে মানবিক দিকটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। ১৬ বছর মানে একটি মানুষের জীবনের প্রায় একটি প্রজন্ম। কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে কেটে যাওয়া ১৬ বছর কোনো আদালতের পরবর্তী খালাসের মাধ্যমে পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। হারানো সময়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক পরিচয়ের ক্ষতি, মানসিক যন্ত্রণা, এসবের কোনো পূর্ণ ক্ষতিপূরণ নেই।
একজন নির্দোষ মানুষ যদি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ভুলের কারণে বছরের পর বছর কারাগারে থাকেন, তবে সেই দায় শুধু একটি মামলার কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ন্যায়বিচারের মৌলিক উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
হাইকোর্টও বিষয়টিকে সাধারণ ভুল হিসেবে দেখেনি। আদালতের পর্যবেক্ষণে কবির উদ্দিন প্রামাণিকের নথিবদ্ধ করা জবানবন্দিকে আইনের বিধানের বাইরে গিয়ে করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটিকে তার ‘অযোগ্যতা ও পেশাগত অসদাচরণের’ প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচারে দায়রা ক্ষমতা প্রয়োগের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাকে অযোগ্য বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, হাইকোর্ট তাকে সশরীরে হাজির করে সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে। আদালতের সামনে ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার বিধান তুলে ধরার পর তার বক্তব্য ও আচরণ পর্যালোচনা করে আদালত কঠোর মন্তব্য করেছে।
এমনকি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো ভালোভাবে আত্মস্থ করে প্রতি মাসে একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে সেসব বিষয়ে শেখানোর জন্য তাকে মৌখিক পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
তবে উচ্চ আদালত এখানেই থামেনি। নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি সরাসরি না দিয়ে ঘটনার সময় প্রযোজ্য আইনের অধীনে কবির উদ্দিন প্রামাণিকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। রায়ের অনুলিপি এবং সংশ্লিষ্ট জবানবন্দির ফটোকপি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতেও বলা হয়েছে।
অবশ্য কবির উদ্দিন প্রামাণিক জানিয়েছেন, তিনি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
ন্যায়বিচারের মূল কথা হলো, শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়, নিরপরাধকে রক্ষা করাও। আর সেই দায়িত্ব পালনে বিচারকের আইনের বাধ্যতামূলক বিধান উপেক্ষার কোনো স্থান নেই। ১৬ বছর পর উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ অন্তত এটুকু বার্তা দিয়েছে, বিচারের প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়লে, যত দেরিই হোক, আদালত সেই ভুল সংশোধনের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবে না।



















