সংগ্রামের মাঠ পেরিয়ে বঙ্গভবনে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
- আপডেট সময় : ০৪:১৭:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, ছাত্র আন্দোলন, কারাবরণ, শিক্ষকতা, সরকারি দায়িত্ব এবং রাজনীতির নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক শিকড় পারিবারিকভাবেও শক্তিশালী। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের পাঠ শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ছাত্রাবস্থায়। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সংগঠনের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে সামনে আসেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাঁকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করতে হয়।
স্বাধীনতার পর সরাসরি দলীয় রাজনীতির বদলে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন ফখরুল। ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক পদে যোগ দেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেসকো কমিশনেও কাজ করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন। ১৯৮৮ সালে নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর পর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দলের ভেতরেও ধাপে ধাপে শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। ২০০৯ সালে হন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতির কঠিন পর্বে তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
এবার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নতুন অধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবন। সংসদীয় ভোটে বিজয়ের পর নির্বাচন কমিশন তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তাঁর শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
একজন ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, দলীয় মহাসচিব বহু পরিচয়ের পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান।
তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে দলীয় রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর বঙ্গভবনে তাঁর এই অভিষেক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।


















