ঢাকা ০৯:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মন্ত্রিসভায় নতুন পাঁচজন, কে কোন মন্ত্রণালয় পেলেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রিসভায় ৬ নতুন মুখ ৯ মাস পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদায় নিল ইরান যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন বিমানবাহী রণতরি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা সংগ্রামের মাঠ পেরিয়ে বঙ্গভবনে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল শপথ  সন্ধ্যায় মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন নতুন  করে চারজন প্রস্তুত বঙ্গভবন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান   দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদন ঢাকার চাপে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত উপসাগরে নতুন উত্তেজনা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে মুখোমুখি ইরান-আমিরাত বাংলাদেশ-কাতার জ্বালানি ও অর্থখাতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মতি

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদন ঢাকার চাপে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:২০:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ ৫৩ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার চাপে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা যখন চাপ বাড়াচ্ছে তখন বাংলাদেশের বিষয়ে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত। এক্ষেত্রে তারা পারস্পারিক স্বার্থের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দিল্লির এমন অবস্থানকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কূটনৈতিক ভাষায় নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আটকে আছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ। তাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়া দিল্লি সফরের সম্ভাবনাও নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে খবর দিয়েছে দ্য প্রিন্ট।

ভারতীয় এ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের বিভাজন ঢাকার ভারত-নীতিকে স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। আর এ ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর এবং শরীফ ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন খুনিদের হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছে।

ঢাকার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করতে এই পদক্ষেপগুলো জরুরি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিমও সম্প্রতি এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে দুই সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছিল। কিন্তু হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে টানাপড়েনে ওই সফরের প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে।

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, সম্ভাব্য ওই সফর নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আতিথেয়তা দিতে ও বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে নয়া দিল্লি প্রস্তুত।

কিন্তু গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অডিও কলের মাধ্যমে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।

ওই অনুষ্ঠানের আগেই এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছিল বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ঢাকা ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক চায়। তবে নয়া দিল্লিকে অবশ্যই শেখ হাসিনাকে এমন মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখতে হবে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

দ্য প্রিন্টকে ওই সূত্রটি বলেছে, “আগে তাকে (হাসিনা) চুপ করান, তারপর আমরা [বাংলাদেশ] কথা বলতে পারি।”

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গেও ভারত একমত নয়।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেজটিল হচ্ছে ভারত নীতি

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন,শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হওয়া পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া ‘উচিত নয়’।

প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের রাজনৈতিক চাপের মধ্যে তারেক রহমানকে একদিকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দিল্লির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চাপও সামলাতে হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ কেমন সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে দ্য প্রিন্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ শীর্ষ ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য প্রিন্ট লিখেছে, বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজন থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আমলারা ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসন, পানিবণ্টন এবং গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ।

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরুর জন্য ঢাকা গত জুনে দিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়ে রেখেছে, যদিও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের বিষয়টি অনিশ্চয়তায় ঝুলছে।

সুর পাল্টেছে নয়াদিল্লি

এই টানাপড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে’ পরিচালনার কথা বলতে শুরু করেছে ভারত, যা দ্য প্রিন্টের ভাষায়, দিল্লির অবস্থানের ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’।

এই শব্দের ব্যবহার থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নয়াদিল্লি মনে করে, সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বল এখন ঢাকার কোর্টেই।

একই সময়ে ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে তারেক রহমানের ভারত সফরের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন।

১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ত্রিবেদী। এর আগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পরে ত্রিবেদী বলেন, দুই নেতা একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে।

তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরদিন নয়া দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকার অবস্থান সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন ত্রিবেদী।

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, দুই দেশের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক পর্যায়েও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে গত কয়েক মাসে নানাভাবে যোগাযোগ হয়েছে।

তবে এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য প্রিন্ট লিখেছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে সর্বশেষ বিরোধ এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওই উদ্যোগকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত করেছে’।

জরুরি প্রশ্ন গঙ্গা চুক্তি

রাজনৈতিক এই অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ তৈরি না হলে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে।

ঢাকার একটি সূত্র দ্য প্রিন্টকে এমনও বলেছেন, তারেক রহমান দিল্লি না গেলে অচলাবস্থা কাটাতে নরেন্দ্র মোদী নিজেই বাংলাদেশ সফর করতে পারেন। যদিও ঢাকা থেকে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এখনও জানানো হয়নি।

ভারত মনে করে, দুই দেশের সম্পর্ক সচল রাখতে দিল্লি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে সরবরাহ সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানাতে দিল্লি দ্বিধা করেনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বার হাসান দ্য প্রিন্টকে বলেছেন, ভারতের প্রতি ঢাকার কড়া ভাষা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারে যিনি ‘ভারতের সামনে মাথা নত করেন না’।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটা কোনো উদ্ভাবনী নীতি নয়, বরং এটা প্রতিক্রিয়াশীল। এর মানে হল, এই নীতির নিয়ন্ত্রণ ঢাকার হাতে নেই, বরং বেশিরভাগটাই ভারতের হাতে। এ ধরনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এর মূল্য দিতে হতে পারে।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদন ঢাকার চাপে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত

আপডেট সময় : ০২:২০:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা যখন চাপ বাড়াচ্ছে তখন বাংলাদেশের বিষয়ে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত। এক্ষেত্রে তারা পারস্পারিক স্বার্থের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দিল্লির এমন অবস্থানকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কূটনৈতিক ভাষায় নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আটকে আছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ। তাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়া দিল্লি সফরের সম্ভাবনাও নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে খবর দিয়েছে দ্য প্রিন্ট।

ভারতীয় এ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের বিভাজন ঢাকার ভারত-নীতিকে স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। আর এ ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর এবং শরীফ ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন খুনিদের হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছে।

ঢাকার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করতে এই পদক্ষেপগুলো জরুরি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিমও সম্প্রতি এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে দুই সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছিল। কিন্তু হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে টানাপড়েনে ওই সফরের প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে।

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, সম্ভাব্য ওই সফর নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আতিথেয়তা দিতে ও বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে নয়া দিল্লি প্রস্তুত।

কিন্তু গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অডিও কলের মাধ্যমে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।

ওই অনুষ্ঠানের আগেই এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছিল বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ঢাকা ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক চায়। তবে নয়া দিল্লিকে অবশ্যই শেখ হাসিনাকে এমন মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখতে হবে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

দ্য প্রিন্টকে ওই সূত্রটি বলেছে, “আগে তাকে (হাসিনা) চুপ করান, তারপর আমরা [বাংলাদেশ] কথা বলতে পারি।”

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গেও ভারত একমত নয়।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেজটিল হচ্ছে ভারত নীতি

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন,শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হওয়া পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া ‘উচিত নয়’।

প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের রাজনৈতিক চাপের মধ্যে তারেক রহমানকে একদিকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দিল্লির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চাপও সামলাতে হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ কেমন সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে দ্য প্রিন্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ শীর্ষ ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য প্রিন্ট লিখেছে, বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজন থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আমলারা ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসন, পানিবণ্টন এবং গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ।

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরুর জন্য ঢাকা গত জুনে দিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়ে রেখেছে, যদিও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের বিষয়টি অনিশ্চয়তায় ঝুলছে।

সুর পাল্টেছে নয়াদিল্লি

এই টানাপড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে’ পরিচালনার কথা বলতে শুরু করেছে ভারত, যা দ্য প্রিন্টের ভাষায়, দিল্লির অবস্থানের ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’।

এই শব্দের ব্যবহার থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নয়াদিল্লি মনে করে, সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বল এখন ঢাকার কোর্টেই।

একই সময়ে ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে তারেক রহমানের ভারত সফরের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন।

১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ত্রিবেদী। এর আগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পরে ত্রিবেদী বলেন, দুই নেতা একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে।

তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরদিন নয়া দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকার অবস্থান সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন ত্রিবেদী।

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, দুই দেশের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক পর্যায়েও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে গত কয়েক মাসে নানাভাবে যোগাযোগ হয়েছে।

তবে এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য প্রিন্ট লিখেছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে সর্বশেষ বিরোধ এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওই উদ্যোগকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত করেছে’।

জরুরি প্রশ্ন গঙ্গা চুক্তি

রাজনৈতিক এই অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ তৈরি না হলে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে।

ঢাকার একটি সূত্র দ্য প্রিন্টকে এমনও বলেছেন, তারেক রহমান দিল্লি না গেলে অচলাবস্থা কাটাতে নরেন্দ্র মোদী নিজেই বাংলাদেশ সফর করতে পারেন। যদিও ঢাকা থেকে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এখনও জানানো হয়নি।

ভারত মনে করে, দুই দেশের সম্পর্ক সচল রাখতে দিল্লি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে সরবরাহ সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানাতে দিল্লি দ্বিধা করেনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বার হাসান দ্য প্রিন্টকে বলেছেন, ভারতের প্রতি ঢাকার কড়া ভাষা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারে যিনি ‘ভারতের সামনে মাথা নত করেন না’।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটা কোনো উদ্ভাবনী নীতি নয়, বরং এটা প্রতিক্রিয়াশীল। এর মানে হল, এই নীতির নিয়ন্ত্রণ ঢাকার হাতে নেই, বরং বেশিরভাগটাই ভারতের হাতে। এ ধরনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এর মূল্য দিতে হতে পারে।”