ঘুরে দাঁড়ানোর ছয় মাস “ধ্বংসস্তূপ সামলে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠনের পথে সরকার”
- আপডেট সময় : ১২:০৪:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, চাপের মুখে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের ভার নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর আজ পূর্ণ হলো সরকারের প্রথম ছয় মাস।
এই ১৮০ দিনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একক মেগা প্রকল্প নয়; বরং সংকটে থাকা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করা, অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে দৃশ্যমান কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ।
সরকার গঠনের বিষয়টি সরকারি গেজেটেও নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন এবং তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের অনুমোদন দেন।
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনীতি। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ডলারবাজারের অস্থিরতা, বিনিয়োগের মন্থরতা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ, সব মিলিয়ে অর্থনীতিকে দ্রুত স্বাভাবিক ধারায় ফেরানো ছিল জরুরি।
গত ছয় মাসে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য হয়েছে আস্থা পুনর্গঠন। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ৩৬.৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল, আন্তর্জাতিক হিসাবপদ্ধতি BPM6 অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১.৯ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে এখনই চূড়ান্ত সাফল্য বলা যাবে না। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, এসব ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

“ধ্বংসস্তূপ সামলে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠনের পথে সরকার”
শিল্প পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রেও সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পুনরায় চালুর পরিকল্পনার আওতায় ২৫টি বন্ধ পাটকলের মধ্যে ১৪টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং এর মধ্যে নয়টি উৎপাদনে ফিরেছে। অবশিষ্টগুলোর ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে কার্যক্রম চলছে।
কৃষিকে ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষিঋণ নিয়ে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রচলিত অর্থে সব কৃষিঋণ মওকুফ নয়, সরকার সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও তার সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে কৃষকদের সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।
এর পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, সেচ, বীমা এবং বাজার ও আবহাওয়ার তথ্যসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার একটি হলো এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, যার ৮০ শতাংশ নারী করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গ্রাম ও শহরের মানুষের কাছে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও জুলাইয়ে একই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন উদ্যোগ। মার্চে পরীক্ষামূলকভাবে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে কর্মসূচিটির জন্য ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে প্রায় ৪১ লাখ নারীকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন সরকারের আরেকটি বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর জবাবদিহির আওতায় আনা। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী প্রভাবমুক্ত করার আলোচনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি পূরণ করা সরকারের জন্য একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কঠিন পরীক্ষা। সংস্কার যাতে কেবল আইন বা নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বাস্তব পরিবর্তন আনে সেটিই আগামী দিনের মূল প্রশ্ন।

“ধ্বংসস্তূপ সামলে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠনের পথে সরকার”
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত হত্যা, গুম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের বিচার সামনে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও সরকারের ছয় মাসের আলোচিত দিক। এর মধ্যে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মামলায় ৪৫ বছর ধরে পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁকে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ধরনের পদক্ষেপ বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার বার্তা দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনের শাসন, প্রমাণের মান এবং আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের সমর্থকদের কাছে প্রথম ছয় মাস রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরির সময়। অর্থনীতি স্থিতিশীল করার উদ্যোগ, বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে একটি নতুন প্রশাসনিক দিকনির্দেশনার চিত্র তৈরি হয়েছে।
কিন্তু সামনে কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের গভীর সংস্কার, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ কোনোটিই ছয় মাসে শেষ করার বিষয় নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, অতীতের অপ্রয়োজনীয় ও অতিব্যয়ী প্রকল্প, দুর্বল পরিকল্পনা, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের যে বোঝা অর্থনীতির ওপর তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে শুধু নতুন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন কঠোর ব্যয়শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই আগামী ছয় মাসের লক্ষ্য আরও কঠিন ‘ঘুরে দাঁড়ানোর’ প্রাথমিক পর্বকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া। প্রথম ১৮০ দিন যদি রাষ্ট্রযন্ত্রকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় হয়ে থাকে, তবে পরবর্তী ১৮০ দিন হবে সেই ভিত্তির ওপর জনগণের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার পরীক্ষা।
বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত সাফল্যের হিসাব করবে পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে, বাজারে স্বস্তি এসেছে কি না, তরুণের চাকরি হয়েছে কি না, কৃষক ন্যায্য দাম পেয়েছেন কি না, ব্যবসা সহজ হয়েছে কি না এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সত্যিই নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করছে কি না। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে।



















