গাইবান্ধায় বৃষ্টিতে নষ্ট বীজতলা, দ্বিগুণ দামে চারা কিনে বিপাকে আমনচাষিরা
- আপডেট সময় : ০৯:৪৮:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
‘গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টিতে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে, পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর বীজতলা’
কৃষকদের অভিযোগ, জেলার পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ খাল-বিলের অনেকগুলো বর্তমানে দখল ও ভরাট হয়ে পানি নিষ্কারশন বাধাগ্রস্ত
টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধায় আমন ধানের বীজতলা পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আমন চাষের শুরুতেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার বহু কৃষক। নিজেদের তৈরি বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে বেশি দামে ধানের চারা কিনে জমিতে রোপণ করতে হচ্ছে তাদের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি প্রস্তুত, চারা পরিবহন, রোপণ, সার-কীটনাশক ও আগাছা পরিষ্কারের অতিরিক্ত খরচ। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে আমন ধান চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।
শনিবার বিকেলে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর হাটে আমন ধানের চারা কিনতে এসে এমন দুর্ভোগের কথা জানান সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষি রাঙ্গা মোল্লা।
তিনি বলেন, ১০ শতক জমিতে আমনের বীজ ছিটিয়েছিলেন। কয়েক দিনের ঝড়-বৃষ্টির পানিতে পুরো বীজতলা তলিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় বীজ পচে নষ্ট হয়েছে। এবার প্রায় তিন বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করবেন তিনি। কিন্তু নিজের বীজতলার চারা না থাকায় বাধ্য হয়ে হাট থেকে চারা কিনতে হচ্ছে।
তাঁর হিসাবে, ১০ পণ চারা কিনতে সাড়ে সাত হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর সঙ্গে ইজারাদারের টোল হিসেবে দিতে হয়েছে আরও ২০০ টাকা। বাড়িতে চারা নিয়ে যেতে ভ্যানভাড়া, জমি হাল-চাষ, চারা রোপণের শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশক কেনা এবং পরবর্তী সময়ে নিড়ানি দেওয়ার খরচও রয়েছে। সব মিলিয়ে আমন আবাদে যে ব্যয় হবে, ধান বিক্রি করে সেই টাকা ওঠানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন তিনি।

কৃষকেরা জানান, আমন চাষের জন্য বীজতলা তৈরিতে আগে থেকেই অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। বীজতলা নষ্ট হওয়ায় সেই বিনিয়োগ একদিকে যেমন পানিতে গেছে, অন্যদিকে নতুন করে চারা কিনতে হচ্ছে। ফলে একই জমিতে চারা উৎপাদন ও চারা কেনার জন্য দুই দফা খরচ করতে হচ্ছে তাদের। বর্গাচাষিদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি। কারণ জমির ইজারা বা বর্গা খরচের পাশাপাশি উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপের ব্যয় তাদের বহন করতে হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর। এসব জমিতে আমন ধানের চারা উৎপাদনের জন্য ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে এর মধ্যে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর বীজতলা। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।
জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা জানান, সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত আমনের বীজতলা তৈরি করা হয়। শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এসব বীজতলার চারা মূল জমিতে রোপণ করা হয়। কিন্তু গত জুলাই মাসে টানা বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
একই সময়ে নদ-নদীর পানিও বাড়তে থাকে। এতে নিম্নাঞ্চলের অনেক বীজতলা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে। পর্যাপ্ত সময় পানির নিচে থাকায় কচি ধানের চারা পচে নষ্ট হয়ে যায়।
পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া বলেন, এ বছর প্রায় আট বিঘা জমিতে আমন চাষের জন্য ২৫ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। প্রায় ২০ থেকে ২২ দিনের চারা এক সপ্তাহ পানির নিচে থাকায় সব পচে গেছে। এখন বাধ্য হয়ে হাট থেকে বেশি দামে চারা কিনে জমিতে রোপণ করছেন তিনি। এতে তাঁর আমন আবাদে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
কৃষকেরা বলছেন, বীজতলা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অতিবৃষ্টিতে জমি প্রস্তুত করতেও সমস্যা হচ্ছে। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় সময়মতো হাল-চাষ করা যাচ্ছে না। ফলে জমি প্রস্তুত করতে বাড়তি সময় ও শ্রম লাগছে। কোথাও কোথাও জমি থেকে পানি সরাতে না পারায় নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আবার পানি কমে যাওয়ার পর দ্রুত জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে। শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে।

বীজতলা নষ্ট হওয়ার কারণে শুধু চারা কেনার খরচই বাড়েনি, চারা সংগ্রহ ও পরিবহনেও কৃষকদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। দূরের হাট থেকে চারা আনতে ভ্যান বা অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া দিতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি জমিতে চারা রোপণের জন্য শ্রমিক নিয়োগ, সার প্রয়োগ, কীটনাশক ব্যবহার এবং পরবর্তী সময়ে আগাছা পরিষ্কারের খরচও রয়েছে। ফলে আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের ব্যয়ের চাপ বেড়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি শান্তিরাম গ্রামের কৃষক ওসমান গনি বলেন, বৃষ্টিতে বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন চড়া দামে চারা কিনতে হচ্ছে। কৃষকের এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারিভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা চলতি মৌসুমে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের বর্গাচাষি সৈয়দ আলীও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বীজতলা নষ্ট হওয়ার পর নতুন করে চারা কেনা এবং জমি প্রস্তুতের খরচ বহন করা ছোট ও বর্গাচাষিদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, জেলার পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ খাল-বিলের অনেকগুলো বর্তমানে দখল ও ভরাটের কারণে সংকুচিত হয়েছে। কোথাও খাল-বিল ভরাট করে বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কোথাও আবার পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে মাছ চাষ বা ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।
এতে অতিবৃষ্টি কিংবা উজানের ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ফলে নিচু এলাকার কৃষিজমি ও বীজতলা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকছে। কৃষকদের দাবি, পানি নিষ্কাশনের পথগুলো দখলমুক্ত ও সচল করা গেলে ভবিষ্যতে এমন ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এদিকে শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে জেলায় আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত চারা, বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সহায়তার দাবি উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ গাইবান্ধা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বীজতলা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগামী রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনার বীজ ও সার দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
কৃষকদের মতে, শুধু ভবিষ্যৎ মৌসুমে প্রণোদনা দিলেই বর্তমান ক্ষতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। এখনই ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলার কৃষকদের তালিকা তৈরি করে চারা ও কৃষি উপকরণ সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া দরকার।
একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল-বিলগুলো দ্রুত সচল করা প্রয়োজন। তা না হলে প্রতি বছর অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার সময় একই ধরনের ক্ষতির পুনরাবৃত্তি হবে এবং আমনসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে কৃষকের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, চলতি আমন মৌসুমে গাইবান্ধার কৃষকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো চারা সংগ্রহ করে জমিতে রোপণ করা এবং বাড়তি উৎপাদন খরচ সামলে ফসল ঘরে তোলা।
নিজেদের বীজতলা হারিয়ে যারা দ্বিগুণ দামে চারা কিনছেন, তাদের জন্য ধানের ফলন ও বাজারদরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তারা কতটা সামলাতে পারবেন। কৃষকদের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তার পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে বীজতলা ও কৃষিজমি রক্ষায় স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে।




















