ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে ওঠার শঙ্কা আইএমএফের সৌদিগামী ৬১ ফ্লাইট বাতিল, প্রবাসীদের  ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভোগান্তিতে ৯২৬৯ যাত্রী নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে  ঘিরে প্রবাসীদের ক্ষোভ কর ফাঁকির চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেনি গ্রামীণ কল্যাণ: হাই কোর্ট নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে, অধিকাংশ শর্তে একমত বাংলাদেশ সৌদির কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা, ২ বাংলাদেশিসহ নিহত  ১২ বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেবে ঢাকা মক্কা-মদিনার নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়, সৌদি আরবকে সহায়তায় প্রস্তুত বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দিল্লিতে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কী ঘটেছে তাঁকে ঘিরে

পাহাড়ধস ও বন্যা চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বিপর্যয় প্রাণহানি বেড়ে ৩৫ পানিবন্দি লাখো মানুষ

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:০৮:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ ২৬৭ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৩৫ পানিবন্দি লাখো মানুষ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টানা কয়েক দিনের রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, দেয়ালধস এবং পানির তীব্র স্রোতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২১৪ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কাচালং, চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে চার জেলার শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

কক্সবাজারে সর্বোচ্চ প্রাণহানি

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। টানা বর্ষণে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও বন্যার পানিতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হলো উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প, চকরিয়া, কক্সবাজার পৌরসভা, রামু, টেকনাফ, পেকুয়া ও মহেশখালী।

চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মহছনিয়াকাটা এলাকার ডেবলতলীতে পাহাড়ধসে বসতঘর চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশু রুমি আক্তার (১৫) ও ওয়াহিদুল ইসলাম (১০) মারা যায়।

উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মহিলা হেফজখানায় পাহাড়ধস ও দেয়ালধসে রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), উমাইসা বিবি (১৩) এবং শিক্ষিকা শাহিদার মৃত্যু হয়।

ক্যাম্প-১১ এর বালুখালী এলাকায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সহোদর উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) নিহত হন।

এ ছাড়া জামতলী ক্যাম্প-১৫-এ পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় মোহাম্মদ কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছরের ছেলে আরফাত নিহত হন।

কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর (৫০) এবং উখিয়ার হলদিয়াপালং ইউনিয়নে দেয়ালধসে মোহাম্মদ মানিক (৪০) নিহত হন। এছাড়া কুতুপালং ক্যাম্প, মহেশখালী, টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা প্রাণ হারিয়েছেন।

মাতামুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে চকরিয়া ও পেকুয়ার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, টেকনাফ ও উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন ডুবে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছে।

 চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৩৫ পানিবন্দি লাখো মানুষ
চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৩৫ পানিবন্দি লাখো মানুষ

বান্দরবানে পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিনজনসহ নিহত ৫

বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় পৃথক দুই পাহাড়ধসে দুটি পরিবার মাটির নিচে চাপা পড়ে।

নিহতরা হলেন মো. ইউনুস (৪০), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫), তাঁদের পাঁচ বছরের ছেলে সোলেমান, মো. জুয়েল (৩৪) এবং কুলছুমা আক্তার (২৫)।

সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের লাল ব্রিজ এলাকায় পাহাড়ধসে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। রুমা ও রোয়াংছড়ির বেইলি ব্রিজ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির কারণে ১২ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল ও নদীপথে পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।

রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও বন্যার তাণ্ডব

রাঙামাটিতে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি ঢলে নদী পার হওয়ার সময় একজন এবং বিলাইছড়িতে এক ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন। কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে দুই শিশু আহত হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯৮টি স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধস হয়েছে। এর মধ্যে বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাউখালীতে ৩০টি, কাপ্তাইয়ে ১৫টি এবং রাঙামাটি সদরে ১১টি স্থানে ধসের ঘটনা ঘটেছে।

কাচালং নদীর পানি উপচে বাঘাইছড়ির অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সাজেক ভ্যালিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটক প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলায় ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৪টিতে দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

খাগড়াছড়িতে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি

খাগড়াছড়িতে এখন পর্যন্ত প্রাণহানির খবর না মিললেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস হয়েছে। চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দীঘিনালা, মহালছড়ি ও সদর উপজেলার অন্তত ৪০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

প্রায় আট হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, মহালছড়ি ও সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

 চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৩৫ পানিবন্দি লাখো মানুষ
চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৩৫ পানিবন্দি লাখো মানুষ

চট্টগ্রামে ছয়জনের মৃত্যু, ৪৩ বছরের রেকর্ড বৃষ্টিপাত

চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সীতাকুণ্ডের ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম তানভীর, পাঁচলাইশের সুমাইয়া আক্তার (১২), রহমাননগরের শফিকুল রহমান (৩০), রাউজানের মোস্তাকিম (৩) এবং বোয়ালখালীর খালে ভেসে যাওয়া এক তরুণ।

রেকর্ড বৃষ্টিতে নগরের মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, চকবাজার, খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও আনোয়ারার বিস্তীর্ণ এলাকাও প্লাবিত হয়েছে।

রেললাইনের ওপর পানি ওঠা ও গাছ উপড়ে পড়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সময়সূচিও বিঘ্নিত হয়েছে।

প্রশাসনের তথ্য ও ত্রাণ কার্যক্রম

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যে বিভাগজুড়ে ২৪ জনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৫ জন, কক্সবাজারে ১৮ জন (রোহিঙ্গাসহ) এবং রাঙামাটিতে একজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ২১ জন। তবে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী মোট প্রাণহানি অন্তত ৩৫ জনে পৌঁছেছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভাগজুড়ে ৩ হাজার ৩৯৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রায় ৬ হাজার ২৯৯ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

এ পর্যন্ত দুর্গত মানুষের মধ্যে ২ হাজার ৪৮২ প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ১৫০ প্যাকেট শিশু খাদ্য, ১৪৮ মেট্রিক টন চাল এবং ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রশাসন

বিভাগীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কিছু এলাকায় কমতে শুরু করলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং, উদ্ধার কার্যক্রম এবং মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার এবং নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :