প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বড় সাফল্য বাংলাদেশে ৯.২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ ১১ চীনা প্রতিষ্ঠানের
- আপডেট সময় : ০৭:৫৫:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের ফল; জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্পে নতুন বিনিয়োগে অর্থনীতিতে আসতে পারে গতি, তৈরি হতে পারে লাখো কর্মসংস্থান
চীনের চার দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের তাৎক্ষণিক ইতিবাচক ফল মিলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীনের ১১টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জন্য এটিই অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
শনিবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এই ইতিবাচক বার্তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের করনীতি-সংক্রান্ত পূর্বাভাস (ট্যাক্স আউটলুক) প্রকাশ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়নি, বরং বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির বিনিয়োগকারীদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ। এছাড়া পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রকল্পে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে ৮৯০ মিলিয়ন ডলার, মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন ও লজিস্টিকস হাব গড়ে তুলতে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে।
এ ছাড়া গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্মার্ট বৈদ্যুতিক মিটার উৎপাদন, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, পুনর্ব্যবহৃত তুলা ও সুতা উৎপাদন, লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলগাড়ির যন্ত্রাংশ সংযোজন কারখানা, আধুনিক অ্যাপ্লাইড বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা শিল্পপার্ক এবং চীনা ভেষজ উদ্ভিদভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতেও কয়েকশ কোটি ডলারের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বিশেষ করে মোংলা ও পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা এসেছে, তা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা, কোল্ড-চেইন সুবিধা এবং ই-কমার্স অবকাঠামো উন্নত হলে রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে।
বিডার তথ্যমতে, শুধু মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প থেকেই প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও একসঙ্গে ১১টি শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের প্রতি আস্থা বৃদ্ধিরও প্রতিফলন।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের অন্যতম বড় অর্জনই হলো এই বিপুল বিনিয়োগ আগ্রহ। দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।



















