চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিনিয়োগ, কৌশলগত অংশীদারত্ব ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
- আপডেট সময় : ১০:২৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
- চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ অন্তত ১৫টি দলিল সইয়ের প্রস্তুতি।
- চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ জিডিআইয়ে যুক্ততা।
- বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে সমঝোতা স্মারক।
- আলোচনা হবে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে।
বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার, রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয়।
আজ বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন প্রত্যাশা
সরকারি সূত্র জানায়, সফরকালে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও প্রটোকলসহ অন্তত ১৫ থেকে ১৭টি দলিলে স্বাক্ষরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এসব দলিলের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা এবং গণমাধ্যম সহযোগিতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তুলে ধরবেন। পাশাপাশি চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন খাতে নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।

রাজনৈতিক সম্পর্কেও নতুন মাত্রা
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। সফরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)-এর মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের যোগাযোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।
জিডিআইয়ে যুক্ততা: কৌশলগত সহযোগিতার নতুন অধ্যায়
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রস্তাবিত ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন উত্তরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) বাংলাদেশের অংশগ্রহণের পর এবার জিডিআই-সংক্রান্ত সমঝোতা দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের ভাষায়, জিডিআইয়ে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে এবং বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করবে।

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বহুল আলোচিত তিস্তা নদীভিত্তিক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পও আলোচনার অন্যতম বিষয় হবে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষ মতবিনিময় করবে বলে জানা গেছে।
একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সফরের তাৎপর্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিক থেকেই নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। চীনকে ঘিরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সময়ে বাংলাদেশের এই উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের যে কৌশল গ্রহণ করেছে, এই সফর তারই প্রতিফলন।
সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক
শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
সফর শেষে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার লক্ষ্যে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সমঝোতাগুলো আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফরকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের একটি সম্ভাবনাময় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জিডিআইয়ে সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।



















