যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নতুন মোড় দশকের বৈরিতার পর সমঝোতা নতুন অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
- আপডেট সময় : ০৮:৪৩:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘদিনের বৈরিতা, উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি যুদ্ধবিরতি নয়; বরং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক মোড়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের যে নাটকীয় উত্থান-পতন দেখা গেছে, তার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি।
বুধবার স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। মূলত শুক্রবার জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই সম্পন্ন হয়।
চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুই দেশের কর্মকর্তারা বিস্তারিত আলোচনা চালাবেন।
১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় হলো—
- হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
- ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পরিকল্পনা।
- ইরানের ওপর আরোপিত বিদ্যমান সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি।
- আন্তর্জাতিকভাবে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ ধাপে ধাপে মুক্ত করার উদ্যোগ।
-

দশকের বৈরিতার পর সমঝোতা নতুন অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইরানের ১০০ থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবরুদ্ধ রয়েছে।
চুক্তির ফলে যদি এসব সম্পদ মুক্ত করা হয় এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ কারণে ইরানের জনপরিসরে এই চুক্তিকে অনেকেই কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ চুক্তিটিকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার ভাষায়, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে তার কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি। এ দুটির মধ্যে কোনো তুলনাই চলে না।”
এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
যদিও চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত মিলেছে, তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি নেতৃত্ব ট্রাম্পের এই মন্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে বরং চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনাকে উদযাপনেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সাইমন মেয়ল মনে করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কূটনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে।
তার মতে, কয়েক দশক ধরে পশ্চিম এশিয়ায় বিতর্কিত ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও ইরানের জন্য এটি একটি অত্যন্ত ভালো চুক্তি। সামরিক সংঘাত শুরুর পর যে ফলাফল প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তারা তার চেয়েও বেশি অর্জন করেছে।

তিনি আরও মনে করেন, আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকলেও ইরান চুক্তি ভঙ্গ করে আবার যুদ্ধে ফিরবে—এমন সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে দেশটির নেতৃত্ব এখন নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।
জেনারেল মেয়লের ভাষায়, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব আগের প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন। তারা আদর্শগতভাবে কট্টর হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও বিবেচনায় নিচ্ছে। তাই তারা আবার সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের পথেই হাঁটতে চাইবে।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা একই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন। ফলে অনেক পর্যবেক্ষক এটিকে শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘ বৈরিতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
তবে সামনে রয়েছে আরও কঠিন পরীক্ষা। আগামী ৬০ দিনের আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। আর আলোচনা ভেঙে গেলে অঞ্চলটি আবারও অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের দিকে ফিরে যেতে পারে।
এ মুহূর্তে বিশ্বের নজর তাই ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।



















