ঢাকা ০৩:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
লক্কড়ঝক্কড় গাড়ির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে মাঠে নামছে ডিএমপি থ্রি-প্লাস প্রযুক্তিতে নিরাপদ রূপপুর, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ তিস্তা মহাপরিকল্পনা নতুন করে আলোচনা, চীন সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে ইস্যুটি যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এখনো বিবেচনা করছে ইরান হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে রোদে স্বস্তি, ধান শুকাতে ব্যস্ত হাওরের কৃষক গেরুয়া ঝড়ে ভেঙে পড়ল তৃণমূলের দুর্গ, শক্ত অবস্থানে বিজেপি কলকাতায় বিজয় মিছিল ঘিরে উত্তেজনা, মাংসের দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: নাটকীয় উত্থানে আলোচনায় মোতাব শেখ তামিলনাড়ুতে ৭ মে নতুন ইনিংস শুরু করছেন বিজয় থালাপাতি

থ্রি-প্লাস প্রযুক্তিতে নিরাপদ রূপপুর, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:২২:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে

রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র: ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন যুগের সূচনা করেছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্প দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে “ক্লিন এনার্জি” বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎস বলা হচ্ছে, কারণ এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে। যদিও ২০২৩-২৪ সালেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল, বিভিন্ন কারিগরি ও প্রস্তুতিমূলক কারণে সময় পিছিয়েছে। বর্তমানে পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে এবং ধাপে ধাপে কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে যাবে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বরাবরই একটি সংবেদনশীল বিষয়। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরে ব্যবহৃত থ্রি-প্লাস জেনারেশনের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি বিশ্বের আধুনিকতম ও নিরাপদ প্রযুক্তিগুলোর একটি। এই প্রযুক্তিতে এমন কিছু উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো আশঙ্কা এখন আর আগের মতো নেই। কারণ সেই কেন্দ্রগুলোর ডিজাইন ছিল ১৯৭০-এর দশকের প্রযুক্তিনির্ভর, আর রূপপুরের ডিজাইন ২০১৫ সালের আধুনিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি। তিনি জানান, রূপপুরে কোর ক্যাচার ও ডাবল কন্টেইনমেন্ট স্ট্রাকচারের মতো উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা চরম দুর্ঘটনার পরিস্থিতিতেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সক্ষম।

রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের নির্মাণাধীন এই প্রকল্পে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প, বন্যা কিংবা বিমান হামলার মতো পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রটি নিরাপদ থাকবে। টারবাইন শপ অপারেশনের ডেপুটি ম্যানেজার সেগেই অ্যানোসিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই রূপপুর নির্মাণ করা হয়েছে এবং এখানে অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।

নীতিনির্ধারকরাও বলছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কেন্দ্রটি অন্তত ৬০ বছর পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, থ্রি-প্লাস জেনারেশনের এই প্রযুক্তিতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও যাতে আশপাশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, দক্ষ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের মতে, যন্ত্রপাতি যত উন্নতই হোক, পরিচালনায় দুর্বলতা থাকলে তা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

আগস্টে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে আগামী বছরের শেষ নাগাদ পুরো ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

বাংলাদেশের জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উন্নয়নের প্রতীকও। সফলভাবে প্রকল্পটি পরিচালিত হলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

থ্রি-প্লাস প্রযুক্তিতে নিরাপদ রূপপুর, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ

আপডেট সময় : ০২:২২:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন যুগের সূচনা করেছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্প দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে “ক্লিন এনার্জি” বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎস বলা হচ্ছে, কারণ এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে। যদিও ২০২৩-২৪ সালেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল, বিভিন্ন কারিগরি ও প্রস্তুতিমূলক কারণে সময় পিছিয়েছে। বর্তমানে পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে এবং ধাপে ধাপে কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে যাবে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বরাবরই একটি সংবেদনশীল বিষয়। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরে ব্যবহৃত থ্রি-প্লাস জেনারেশনের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি বিশ্বের আধুনিকতম ও নিরাপদ প্রযুক্তিগুলোর একটি। এই প্রযুক্তিতে এমন কিছু উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো আশঙ্কা এখন আর আগের মতো নেই। কারণ সেই কেন্দ্রগুলোর ডিজাইন ছিল ১৯৭০-এর দশকের প্রযুক্তিনির্ভর, আর রূপপুরের ডিজাইন ২০১৫ সালের আধুনিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি। তিনি জানান, রূপপুরে কোর ক্যাচার ও ডাবল কন্টেইনমেন্ট স্ট্রাকচারের মতো উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা চরম দুর্ঘটনার পরিস্থিতিতেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সক্ষম।

রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের নির্মাণাধীন এই প্রকল্পে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প, বন্যা কিংবা বিমান হামলার মতো পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রটি নিরাপদ থাকবে। টারবাইন শপ অপারেশনের ডেপুটি ম্যানেজার সেগেই অ্যানোসিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই রূপপুর নির্মাণ করা হয়েছে এবং এখানে অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।

নীতিনির্ধারকরাও বলছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কেন্দ্রটি অন্তত ৬০ বছর পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, থ্রি-প্লাস জেনারেশনের এই প্রযুক্তিতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও যাতে আশপাশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, দক্ষ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের মতে, যন্ত্রপাতি যত উন্নতই হোক, পরিচালনায় দুর্বলতা থাকলে তা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

আগস্টে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে আগামী বছরের শেষ নাগাদ পুরো ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

বাংলাদেশের জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উন্নয়নের প্রতীকও। সফলভাবে প্রকল্পটি পরিচালিত হলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।