তিস্তা সমস্যা নিয়ে ভারতের জন্য ঢাকা বসে থাকা চলবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০৫:১২:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
তিস্তা পারের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়, তারা ডাক দিয়েছে জাগো বাহে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদলে পুশইনের ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেবে ঢাকা। এসময় মন্ত্রী আরও বলেন, তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের আমলে হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেবে ভারত।
মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে ঢাকায় সফররত মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
তিস্তাপাড়ের মানুষের ‘বাঁচা-মরার’ প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তির জন্য অপেক্ষায় থাকতে চায় না বাংলাদেশ সরকার, বরং এই প্রান্তের উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে চীনের সঙ্গে আলোচনা চালাতে আগ্রহী।
মঙ্গলবার চীন সফরে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিএনপি সরকারের এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বেইজিং সফরে ‘অবশ্যই’ আলোচনা হবে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার আসায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধায় ২০১১ সাল থেকে আটকে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে ঢাকার আশা নিয়ে এক প্রশ্নে মন্ত্রী বলেছেন, ভারতের উদ্যোগের জন্য ঢাকা বসে থাকতে চায় না।
তিনি বলেন, দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে এখনও সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং তারা কী ভাবছেন, কী করবেন, সেটা তারা যদি না জানান, তাদের ‘মাইন্ড রিড’ করার কাজ আমার না।
প্রত্যাশা থাকবে যাতে করে এই চুক্তিটা যেটা হয়েছিল তখন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা ‘কনসিডার’ করতে পারি কিনা। কিন্তু সেজন্য তো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদেরকে করতে হবে।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিল।
মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়।
নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি।
ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট শীর্ষক এ প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ সরকার।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে এটিসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছেন বলে ওই সময় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
তিস্তা প্রকল্পে নদীর তীর ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে সেসময় এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বিবিসি।
এ প্রকল্পে চীনা কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকাকে নয়া দিল্লির উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।
এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ অগাস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা।
এর মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উত্তরবঙ্গে বড় ধরনের কিছু কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সেই আন্দোলনে মূল ভূমিকায় থাকা বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, আন্দোলনের নেতা আসাদুল হাবিব দুলু রয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর দায়িত্বে।
তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি এবং প্রকল্প দুটোই ঝুলে থাকার মধ্যে মঙ্গলবার তিন দিনের সফরে বেইজিং যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি চীনের ‘পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের’ চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তার।
এই সফরের উদ্দেশ্য ও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, চীন আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বন্ধু দেশ, যার সঙ্গে আমাদের স্ট্রাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ পর্যায়ে আমাদের সম্পর্ক। এবং আমাদের নতুন সরকারের তরফ থেকে এটা হচ্ছে চীনে প্রথম সফর।
তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এই সফরে আমরা আমাদের দুদেশের সম্পর্ককে আরও দ্রুত এবং আরও গভীর এবং ব্যপ্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই আমরা চীনের সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক পারস্পরিক সহযোগিতামূলক প্রকল্প এবং কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছি। এবং এই সম্পর্কটাকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের চাইতে উপরে নেওয়া যায় কিনা, সে নিয়ে আমরা আলোচনা করব। তাদেরও আগ্রহ আছে।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনি তিস্তার কথা বললেন… অবশ্যই তিস্তার কথা হবে, অবশ্যই। এইটা আমাদের সেই অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়। তারা ডাক দিয়েছে ‘জাগো বাহে’। সেই ডাকে যদি আমরা সাড়া না দিই, তাহলে পরে আমরা আছি কেন?
এটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার, সেই অঞ্চলের সমস্যা সুরাহা করার এবং এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার আমরা পূরণ করব এবং চীন সফরে এই বিষয়টা আমরা নিশ্চয় আলোচনা করব।
চীনের প্রকল্প এবং ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি-দুটি ভিন্ন বিষয়কে এক করে দেখা প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, সবচেয়ে বড় কথা যেটা হচ্ছে, তিস্তাপাড়ের মানুষের একটা বড় ধরনের ‘ইকোলজিক্যাল’ বিপর্যয়ের মধ্যে তারা আছে, এটা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়।
আমরা যেভাবে পারি, যে কয়টা উপায় আছে, সবগুলো উপায় আমরা অনুসন্ধান করব। যেটা সর্বোত্তম, সেটাই আমরা দিব। এইখানে সবচাইতে বড় আপনার বিচার্য বিষয় হচ্ছে, আমাদের মানুষের ‘ইন্টারেস্ট’, বাংলাদেশ ‘ফার্স্ট’।
পশ্চিমবঙ্গের ভাবি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলাদেশ বিদ্বেষী বিভিন্ন বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ইনের আশঙ্কা নিয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী এ কথাটি বলেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তিনি কিছু কাজ করেছেন, আপনারা দেখেছেন আমরা সেটাকে কড়া প্রতিবাদ দিয়েছি। সে বিষয়ে আমাদের যা যা ব্যবস্থা আমরা নেব।
















