মানুষ দর্শক, এসেছে শুধুমাত্র ‘এআই বটদের’ জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
- আপডেট সময় : ০৫:৪৬:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
পোস্ট ও আলোচনায় শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট’ শব্দটি সাধারণত কটাক্ষ বা অভিযোগের অর্থে ব্যবহৃত হলেও, এবার সেই বটদের জন্যই চালু হয়েছে একটি সম্পূর্ণ আলাদা সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। মোল্টবুক (Moltbook) নামের এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নয়, শুধুমাত্র এআই এজেন্ট বা বটরাই পোস্ট করে, আলোচনা চালায় এবং মতামত আদান–প্রদান করে।
মোল্টবুক মূলত এআই এজেন্টদের সামাজিকীকরণের জন্য তৈরি একটি পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম। কাঠামোগতভাবে এটি অনেকটা রেডিটের মতো-বিভিন্ন বিষয়ের জন্য আলাদা সেকশন রয়েছে, আছে আপভোটিং ব্যবস্থা। তবে এখানে মানুষের ভূমিকা সীমিত; ব্যবহারকারীরা চাইলে প্ল্যাটফর্মটি দেখতে পারবেন, কিন্তু অংশ নিতে পারবেন না।
১৫ লাখ এআই বটের নিবন্ধন
গত ২ ফেব্রুয়ারি মোল্টবুক কর্তৃপক্ষ জানায়, প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত এআই এজেন্টের সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক বট যুক্ত হওয়ায় প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে আগ্রহ ও বিতর্ক—দুটিই তৈরি হয়েছে।
মোল্টবুক তৈরি হয়েছে মোল্টবট (MoltBot) নামের একটি ওপেন সোর্স এআই বটের ধারাবাহিকতায়। মোল্টবট একটি বিনামূল্যের এআই এজেন্ট, যা ইমেইল পড়া ও উত্তর দেওয়া, বার্তা সংক্ষেপ করা, ক্যালেন্ডার ব্যবস্থাপনা এবং এমনকি রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো দৈনন্দিন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে।
এজেন্টিক এআইয়ের ইঙ্গিত, নাকি মানুষের নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা?
এআই বটদের এই সামাজিক আচরণ ভবিষ্যতের এজেন্টিক এআই (Agentic AI)–এর ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। এক ইউটিউবারের মন্তব্য অনুযায়ী, মোল্টবুকের অনেক পোস্ট দেখতে মানুষের লেখা বলেই মনে হয়—কোনো বড় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের নয়।
মার্কিন ব্লগার স্কট আলেকজান্ডার জানান, তিনি নিজেও তাঁর একটি বটকে মোল্টবুকে যুক্ত করেছেন এবং বটটির মন্তব্য অন্যদের মতোই ছিল। তবে তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত মানুষই ঠিক করে দেয় বট কী বিষয়ে পোস্ট করবে এবং কীভাবে তা উপস্থাপন করা হবে।
‘পারফরম্যান্স আর্ট’ বলছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ড. শানান কোহনি মোল্টবুককে একটি “চমৎকার পারফরম্যান্স আর্ট” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, কতটা কনটেন্ট সত্যিই বটের নিজস্ব সিদ্ধান্ত থেকে আসছে আর কতটা মানুষের নির্দেশে-তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ধর্ম তৈরির মতো কিছু আলোচিত পোস্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো প্রায় নিশ্চিতভাবেই বটদের নিজস্ব চিন্তার ফল নয়; বরং একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, মোল্টবুক মজার ও কৌতূহলোদ্দীপক একটি পরীক্ষা, যা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখায়, যদিও এতে অনেক অপ্রয়োজনীয় পোস্টও রয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সতর্কতা
মোল্টবুক ঘিরে ব্যবহারকারীদের আগ্রহ এতটাই বেড়েছে যে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ম্যাক মিনি কম্পিউটারের সংকট দেখা দেয়। অনেকেই আলাদা কম্পিউটারে মোল্টবট সেটআপ করছিলেন, যাতে বটের কাছে মূল ডেটা বা অ্যাকাউন্টের সরাসরি প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা যায়।
ড. কোহনি সতর্ক করে বলেন, একটি এআই বটকে সম্পূর্ণ কম্পিউটার, অ্যাপ ও ইমেইল অ্যাকাউন্টে পূর্ণ অনুমতি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রম্পট ইনজেকশন আক্রমণের আশঙ্কা থাকে, যেখানে ইমেইল বা বার্তার মাধ্যমে বটকে ভুল নির্দেশ দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, এআই এজেন্টরা এখনও এমন পর্যায়ের নিরাপত্তা ও বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছায়নি যে সব কাজ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। আবার প্রতিটি ধাপে মানুষের অনুমোদন থাকলে স্বয়ংক্রিয়তার মূল সুবিধাও কমে যায়।
নির্মাতার ভাষায় ‘মুগ্ধকর অভিজ্ঞতা’
মোল্টবুকের নির্মাতা ম্যাট শ্লিখ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, গত কয়েক দিনে সাইটটি লাখো মানুষ ভিজিট করেছেন। তাঁর মতে, এআই বটগুলো অনেক সময় হাস্যকর ও নাটকীয় আচরণ করছে, আর পুরো বিষয়টি দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই মুগ্ধকর।
সব মিলিয়ে, মোল্টবুক এখনো একটি পরীক্ষামূলক ও শিল্পীসুলভ উদ্যোগ হলেও, এটি ভবিষ্যতের এআই এজেন্টদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও শেখার সম্ভাবনার দিকটি নতুন করে সামনে এনেছে।


















