আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে তারেক রহমান: দ্য ইকোনমিস্ট
- আপডেট সময় : ১০:৩০:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলের দ্বারপ্রান্তে
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানই সবচেয়ে এগিয়ে আছেন, এমন পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যায় সাময়িকীটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের পর দেশটির ক্ষমতার মসনদে বসার শীর্ষ দাবিদার ৬০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৮ মাস আগে সংঘটিত এক ‘বিপ্লব’-এর পর, যখন জেনারেশন জেড-এর নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের হত্যাযজ্ঞ ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের অবসান ঘটে। সাময়িকীটির ভাষায়, ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে ফেরার সুযোগ পেয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের সূচনা করবে।
তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট-এর এই মূল্যায়ন এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুরূপ বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায়।
সাময়িকীটি ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করে জানায়, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ফেরার সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে আসেন, ফলে বাসটি কয়েক মাইলজুড়ে ধীরগতিতে চলতে থাকে-যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে এক নজর দেখতে পারেন।
দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। দেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই পাননি।
নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএস-এর গবেষক শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আমার জীবনের দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।
তিনি আরও বলেন, এখন রাজধানীর রাস্তাঘাটজুড়ে আবার নির্বাচনী ব্যানার দেখা যাচ্ছে, যা দীর্ঘ সময় পর একটি ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করাই হবে শেষ দায়িত্ব। তবে অধিকাংশ মানুষই একমত যে, এই সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে পতন ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে—এর মধ্যে রয়েছে একটি নতুন উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব।
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, দলটি নির্বাচিত হলে ‘সব বাংলাদেশির জন্য সংযত শাসন’ নিশ্চিত করার দাবি করলেও তাদের রাজনৈতিক অগ্রগতি শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলটি নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি এবং অতীতে কখনোই সংসদে ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া একটি দলের পক্ষে দেশ পরিচালনার মতো অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই সাময়িকীটির বিশ্লেষণে বলা হয়, এই সবকিছুই তারেক রহমানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি বর্তমানে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট স্মরণ করিয়ে দেয়, বিএনপি দীর্ঘদিন পরিচালিত হয়েছে তার প্রয়াত মা খালেদা জিয়ার মাধ্যমে, আর তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা-বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান বিস্তারিত না দিলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে তার সরকার বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ বাড়াবে।
তিনি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ভালো হবে। তার ভাষায়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বেশ বাস্তববাদী-তিনি একজন ব্যবসায়ী।
দ্য ইকোনমিস্ট আরও লিখেছে, তারেক রহমানের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের হত্যার জন্য দায়ীদের বিচার হবে, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হবে না।
প্রতিবেদনে তারেক রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৪ সালের বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছে, যেসব সরকার জনগণের জন্য কোনো কার্যকর কর্মসূচি রাখে না, তাদের পরিণতি কী হতে পারে। তার কথায়, প্রতিশোধপরায়ণতা কখনোই ভালো কিছু বয়ে আনে না।
দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেছে দ্য ইকোনমিস্ট। যদিও এখনো অনেকেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যদি রাজনৈতিক পালাবদল না ঘটে, সেই আশঙ্কায়।
সবশেষে সাময়িকীটি লিখেছে, পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে ফিরে আসা এই মানুষটিকে আগের চেয়ে আলাদা মনে হচ্ছে, যা আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে কৌতূহল ও প্রত্যাশা তৈরি করেছে।


















