ভারতে বসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছে আওয়ামী লীগ
- আপডেট সময় : ১০:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৬০ বার পড়া হয়েছে
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পলাতক থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লিতে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তারা দল পুনর্গঠন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের কৌশল নির্ধারণে গোপন বৈঠক ও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে অভিযানে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে পালান। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তাদের মধ্যে অন্তত ৬০০ জন কলকাতায় আশ্রয় নেন।
গণচাপের মুখে গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দলটিকে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের শেষ দিকে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা এই রায়কে ‘মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ভারত থেকেই দলীয় কার্যক্রম ও রাজনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, দিল্লিতে গোপন অবস্থানে থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং বাংলাদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনসহ একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে এনে কৌশলগত বৈঠক করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের তরফে দাবি করা হচ্ছে, দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে ভোটের গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দলের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, তারা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং একে প্রহসন হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, বলছে, এই নির্বাচন গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে। তবে আওয়ামী লীগ ইউনূসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার অভিযোগ তুললেও তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন।
মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, নির্যাতন, গোপন বন্দিশালা, বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ এবং সংবাদমাধ্যম দমনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুতির পর এসব গোপন বন্দিশালার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তবে সমালোচনা থেকে মুক্ত নয় অন্তর্বর্তী সরকারও। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে দণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করেছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করছেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় তাদের শত শত নেতা-কর্মী নিহত বা কারাবন্দী হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, দেশে ফিরলে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকায় তারা ভারতে অবস্থান করছেন।
ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের তরফে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো তাতে সাড়া দেয়নি। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অবমাননাকর বলে উল্লেখ করে।
কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচন ব্যর্থ হলে দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণকে আবার আওয়ামী লীগের দিকে ফেরাবে। সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় স্বীকার করেছেন, দলটি কর্তৃত্ববাদী ছিল এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে তার দাবি, পরিস্থিতি বদলাবে এবং এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না।




















