২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি, অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা
- আপডেট সময় : ০৮:৪৫:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
অর্থনীতিতে ঝুঁকি একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য বাস্তবতা। তবে ঝুঁকির ধরন যদি নৈতিকতা, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়, তাহলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট–২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা-যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি গুরুতর নৈতিক সংকেতও বহন করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধ লেনদেন, চাঁদাবাজি, অর্থপাচার, ছিনতাই ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক আস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রম যখন আইনের বাইরে গিয়ে পরিচালিত হয়, তখন বাজারের ন্যায্যতা ও প্রতিযোগিতার নৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে। এতে সৎ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ধাবিত হয়।
ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত-যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক বাধা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে কঠোর যাচাই-বাছাই।
তৃতীয় ঝুঁকি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে। চতুর্থ ঝুঁকি অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং পঞ্চম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সরকারি, করপোরেট ও পারিবারিক ঋণের বাড়তে থাকা চাপ।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে।
ডব্লিউইএফের এই প্রতিবেদনের জন্য বাংলাদেশে জরিপ পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখেছেন, যা দেশের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ কিছুটা কমেছে, তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের ঝুঁকি নতুন করে বাড়ছে।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে জনগণের বিচ্ছিন্নতাই আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই আস্থাহীনতা যখন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সমাজের নৈতিক ভিতকেও নড়িয়ে দেয়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত, রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব ও ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের শাসন, নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তা না হলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে।


















