বাঘ-হাতি শিকারে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা
- আপডেট সময় : ০৫:৪০:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১০৮ বার পড়া হয়েছে
বাঘ বা হাতি শিকারের মতো অপরাধ দুইবার করলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রেখে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন আইনের ৪১ (১) ধারা অনুযায়ী, বাঘ (বেঙ্গল টাইগার) বা হাতি (এসিয়ান এলিফ্যান্ট) শিকারের জন্য সর্বনিম্ন ২ বছর ও সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কেউ একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে তার সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে
ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি কঠোর ও যুগান্তকারী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে জারি করা ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নতুন অধ্যাদেশে বাঘ ও হাতির মতো তফসিলভুক্ত বিপন্ন ও ঐতিহ্যবাহী বন্যপ্রাণী শিকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশের ৪১ ও ৪৪ ধারায় বলা হয়েছে, তফসিল–১(ক) ভুক্ত বাঘ বা হাতি শিকারের অপরাধে সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।
একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে উন্নীত হবে। এছাড়া অনুমতি ছাড়া বাঘ বা হাতির ট্রফি, মাংস কিংবা দেহাংশ দখলে রাখার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান ও রক্ষিত এলাকার সুরক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান ঘোষণার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রক্ষিত এলাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা বা কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে অভয়ারণ্যের ভেতরে চাষাবাদ, খনিজ সম্পদ আহরণ, আগুন লাগানো এবং আগ্রাসী বিদেশি উদ্ভিদ প্রবেশ করানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বৃক্ষ, ঐতিহ্যবাহী ও পবিত্র বৃক্ষ এবং প্রথাগত ‘কুঞ্জবন’ সংরক্ষণের বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। জীবন রক্ষার প্রয়োজন ছাড়া এসব বৃক্ষ বা বন ধ্বংস করলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে ডিজিটাল মাধ্যমকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্যপ্রাণী ক্রয়–বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার বা বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ভিডিও প্রকাশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী বা ট্রফি দখলে রাখা কিংবা কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও সংরক্ষণের জন্য ‘বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে পুলিশ, কাস্টমস ও বিজিবির সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট’ গঠন করা হবে।
বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিষ্পত্তিতে একটি বৈজ্ঞানিক কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সাইটিস কর্তৃপক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে।
ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও প্রথাগত অধিকার সুরক্ষায় অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, এই আইন প্রণয়নের আগে তাদের ঐতিহ্যগতভাবে সংগৃহীত বন্যপ্রাণীর ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্ন জব্দযোগ্য হবে না। এছাড়া বন্যপ্রাণীর আক্রমণে জানমালের ক্ষতি হলে বা রক্ষিত এলাকার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।
উল্লেখ্য, এই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ২০১২ সালের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ রহিত করা হয়েছে, যা দেশের বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি কঠোর ও আধুনিক আইনগত কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



















