নিষিদ্ধকালীন মা ইলিশ রক্ষা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ
- আপডেট সময় : ০৫:৪১:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯০ বার পড়া হয়েছে
আমিনুল হক ভূইয়া
মা ইলিশ রক্ষা করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রজনন মৌসুমে আইন অমান্যকারী জেলেদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব থাকে। এ সময় নদীতে অন্যান্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, অনেকে ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরেন, যা এই অভিযানকে ব্যর্থ করে দেয়।
প্রভাবশালীদের জালে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের ফলে বাংলাদেশের ইলিশের উৎপাদন কমছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং প্রজনন মৌসুমকে সামনে রেখে আগামী ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর মা ইলিশ আহরোণ নিষিদ্ধ। এসময় নদীতে ইলিশ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভাড়াটে জেলেরা ব্যাপকহারে মা ইলিশ নিধন করে থাকে।
ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, হাতিয়া, নোয়াখালী, মাদারীপুরের প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিষিদ্ধকালীন নদীতে ইলিশ আহরোণে তৈরি হচ্ছে। এসব মৌসুমী তথা ভাড়াটে জেলেরা খুবই হিংস্র। নেপথ্যে তাদের সঙ্গে নৌ-পুলিশ যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিলো ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। সে হিসাবে ইলিশের আহরণ ৪২ হাজার টন কমেছে। তবে, মৎস্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তারা বলেন, সাগরের মোহনা থেকে ভোলা পর্যন্ত বেহুন্দী জাল দিয়ে মাছ শিকারের ফলে শুধু যে ইলিশ ধ্বংস করা হচ্ছে তা নয়. সকল ধরণের মাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। বেহুন্দী জাল ব্যবহারকারীরা কতটা প্রভাবশালী প্রশাসন তাদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারছে না? অথচ দেশে এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ বৃদ্ধি পাবার ২০২৩-২৪ সালে এসে কমেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন। পরের তিন বছর ইলিশের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টনে।
২০১৭-১৮ সালে ইলিশ আহরণ ৫ লাখ ১৭ হাজার থেকে ক্রমশ বেড়ে ২০২১-২২ সালে এসে ৫ লাখ ৬৬ হাজার টনে উন্নীত হয়েছিল। মৎস্য খাতে আর্থসামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে ভবিষ্যতের উন্নয়নের জন্য সম্ভাবনার দাবি রাখে।
এই খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংরাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামগ্রিক কৃষি খাতে মৎস্য খাতের অবদান ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে, যা বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা কম। এই উৎপাদন দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে।
মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের ইকোফিশ প্রকল্পের সাবেক গবেষক ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক হারে অবৈধ জালের ব্যবহার মৎস্য সম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

উপকূলীয় এলাকায় ট্রলিং জাহাজ ৪০ মিটারের কম গভীরতায়ও মাছ আহরণ করছে, যা ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি করছে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের পাশাপাশি অভয়াশ্রমে উন্নয়ন প্রকল্প ইলিশের প্রজনন, উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, ২০২৩ সালে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ফলে ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ ইলিশ সফলভাবে ডিম ছাড়তে সক্ষম হয়েছে, যা ভিত্তি বছর ২০০১-০২ এর তুলনায় ১০৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
ফলে এ বছর প্রায় ৪০ দশমিক ৫৮ হাজার কোটি জাটকা নতুন করে ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে। মা ইলিশ সংরক্ষেণের সুফল পেতে হলে এ বছর উৎপাদিত ইলিশের পোনা (জাটকা) নিবিড়ভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ২০২৩ সালে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১২ অক্টোবর হতে ২ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২২ দিন মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানকালে দেশের ইলিশ সম্পৃক্ত ৩৮ জেলার ১৭৪ উপজেলায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়।
মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান, ২০২৩ বাস্তবায়নকালে জেলে ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা নির্বাহের জন্য ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮৭টি জেলে পরিবারকে ২২ দিনে ২৫ কেজি হারে মোট ১৩ হাজার ৮৭২ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়।

মৎস্য বিভাগ জানায়, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ সালে ৫ দশমিক ৬৬ লাখ মেট্রিক টন, ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৬৫ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৯-২০ সালে ৫ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৮-১৯ সালে ৫ দশমিক ৩২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থ বছরগুলোর উৎপাদন পর্যালোচনা করলে ইলিশ উৎপাদন ছয় বছরের মধ্যে কমে আসার চিত্র মেলে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন।
চার বছরে বার্ষিক উৎপাদন ৬ লাখ ২০ হাজার টন বা ১৬ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মৎস্য অধিদপ্তর। টানা চার অর্থবছরে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম। কিন্তু ২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার আরো কমে গিয়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইলিশ আহরণ কমার কারণ সম্পর্কে চাঁদপুরে অবস্থিত মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু কাওসার দিদার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গত বছর জেলেরা অন্য সময়ের মতো নদী ও সাগরে যেতে পারেননি।

ইলিশের প্রধান তিনটি মাইগ্রেশন পয়েন্ট মেঘনা-তেঁতুলিয়া, পায়রা-বিষখালী ও সুন্দরবন অঞ্চলে নাব্যতার সংকট প্রকট। ফলে ইলিশের চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ইলিশ আহরণের একটি সীমা রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ সেই সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। সেই ফলাফলও স্পষ্ট হয়েছে, ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ।
বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশেই আহরিত হয়। ইলিশ মাছের প্রধান মাইগ্রেশন এলাকা মেঘনা, তেঁতুলিয়া, পায়রা, বিষখালীতে নাব্যতার সংকট দেখা দিয়েছে। ইলিশ মাছের জন্য পাঁচ মিটারের বেশি গভীরতা আদর্শ হলেও, এই নৌপথগুলোতে কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মিটার পর্যন্ত পানি রয়েছে। এ ছাড়াও ইলিশের মাইগ্রেশন পথে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ আহরণ করতে থাকায় ইলিশের উৎপাদন কমছে।



















