সুন্দরবনের নীরব গহিন অরণ্যে রোববার যেন থমকে গিয়েছিল সময়। হরিণ শিকারিদের পাতা নিষ্ঠুর ফাঁদে আটকে পড়া একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার টানা প্রায় ২৪ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মুক্তির আলো দেখেছে। দীর্ঘ উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা আর শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষার পর বন বিভাগের বিশেষ অভিযানে বাঘটিকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয়।
শনিবার দুপুরের পর খবর আসে—শরকির খাল দিয়ে আধা কিলোমিটার ভেতরে, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি এলাকায় একটি বাঘ হরিণ ধরার ফাঁদে আটকে আছে। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বাঘটির আটকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জায়গাটি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মাঝামাঝি দুর্গম বনাঞ্চল।
রোববার সকাল থেকে শুরু হয় উদ্ধার প্রস্তুতি। ঢাকা থেকে আসেন ভেটেরিনারি সার্জনসহ বিশেষজ্ঞ দল, খুলনা থেকে যোগ দেন বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা। চারদিক ঘিরে ফেলা হয় নিরাপত্তায়। কারণ, ফাঁদে আটক বাঘ আহত ও আতঙ্কিত—যে কোনো মুহূর্তে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
দুপুর আড়াইটার দিকে আসে সেই নাটকীয় মুহূর্ত। ‘ট্রানকুইলাইজার গান’ দিয়ে নিখুঁতভাবে ইনজেকশন পুশ করা হয় বাঘটির শরীরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে বনের রাজা। তখনই শুরু হয় সতর্ক উদ্ধার অভিযান। ফাঁদ কেটে মুক্ত করা হয় বাঘটিকে। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় সে ছিল দুর্বল; সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইন দেওয়া হয়।
উদ্ধারের পর বেলা ২টা ৫০ মিনিটে খাঁচাবন্দী বাঘটিকে সুন্দরবন থেকে বের করে আনা হয়। কিন্তু নাটক এখানেই শেষ নয়। বাঘ দেখতে শনিবার সন্ধ্যা থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করে উৎসুক জনতা। রোববার সকালে উদ্ধারকাজের খবরে দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অনেকে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ে, কেউ ছবি তোলে, কেউ ভিডিও করে। মানুষের চাপে উদ্ধারকারী দলকে পড়তে হয় চরম বেগে।
শেষ পর্যন্ত বন বিভাগের কর্মীরা বাঘটিকে মোংলা হয়ে খুলনার বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারের দিকে নিয়ে যান। করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, সেখানে চিকিৎসা শেষে বাঘটির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই উদ্ধার অভিযান শুধু একটি বাঘের জীবন বাঁচানোর গল্প নয়; এটি সুন্দরবনের নীরব আর্তনাদ—বন্য প্রাণী রক্ষায় মানুষের দায়িত্বের কথাও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।