সব্জির বাম্পার ফলনে ধস, দুই টাকা কেজিতে ফুলকপি বিক্রি-বগুড়ার কৃষকের মাথায় হাত
- আপডেট সময় : ০১:০২:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭২ বার পড়া হয়েছে
দেশের উত্তর জনপদ বগুড়া, জয়পুরহাট ও আশপাশের জেলা দীর্ঘদিন ধরেই শাক-সবজি ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য পরিচিত। উর্বর মাটি ও পরিশ্রমী কৃষকের ঘামে এখানে প্রতি মৌসুমেই মাঠ ভরে ওঠে সবুজ ফসলে। কিন্তু চলতি ভর মৌসুমে সেই বাম্পার ফলনই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।
বগুড়ার বিভিন্ন হাটে এখন ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই টাকা কেজি দরে। একই সঙ্গে বাঁধাকপি, মুলা, টমেটো, সিমসহ অন্যান্য সবজির দামও নেমে এসেছে উৎপাদন খরচের অনেক নিচে। কৃষকদের ভাষ্য, ক্ষেত থেকে সবজি তুলে বাজারে আনতেই যে খরচ হচ্ছে, তা-ই উঠছে না। ফলে অনেকেই লোকসানের ভয়ে ক্ষেতেই ফসল ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
এর আগেও একই চিত্র দেখা গেছে। গেল মৌসুমে জয়পুরহাট জেলায় রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদন হলেও কৃষকরা আলুর ন্যায্য মূল্য পাননি। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে বহু কৃষক দেনার বোঝায় পড়েন। এবার সেই দুঃস্বপ্নই ফিরে এসেছে সবজি চাষিদের জীবনে।
অথচ এই ফুলকপিই রাজধানী ঢাকার বাজারে আকারভেদে প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। মধ্যস্বত্বভোগী ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মাঠপর্যায়ের কৃষক আর ভোক্তার মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল মূল্য বৈষম্য। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন, সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন। সংরক্ষণ ব্যবস্থা, হিমাগার, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ না নিলে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন অনেকেই। সবজির মাঠে বাম্পার ফলন থাকলেও কৃষকের মুখে এখন শুধুই হতাশার ছায়া।
বগুড়া জেলার সর্ববৃহৎ কাঁচা শাক-সবজির পাইকারি বাজার মহাস্থান হাট এখন সবুজ শাকসবজিতে উপচে পড়ছে। প্রতিদিনের মতো শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ভালো দামের আশায় ট্রাক, ভ্যান ও নছিমনে করে তাদের উৎপাদিত সবজি হাটে নিয়ে আসেন। হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় চোখে পড়লেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় শীতকালীন ভরা মৌসুমে চরম লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা।
চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত আমদানি, বাইরের মোকাম থেকে বেপারি না আসা এবং সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় টাটকা সবজি নামমাত্র দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এতে উৎপাদন, পরিবহন ও শ্রমিক মজুরি—কোনো খরচই উঠছে না বলে দাবি কৃষকদের।
মহাস্থান হাট ঘুরে দেখা গেছে, ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ১২০ টাকা মণ দরে (৪০ কেজি), যা কেজিতে পড়ে প্রায় দুই টাকা। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও একই ফুলকপি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। মুলা ৪০০–৬০০ টাকা মণ, পাতা কপি প্রতিটি ৭ থেকে ১৫ টাকা, সিম ১৬ টাকা কেজি, করলা ৪০, পেঁয়াজ ৬০ ও পাতা পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন আলুর আমদানি বাড়ায় দাম নেমে এসেছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ পর্যন্ত, যা গত সপ্তাহে ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা।
বগুড়া সদরের লাহিড়িপাড়া, চন্ডিহারা ও তেলিহারার কৃষকরা জানান, ফুলকপি এখন যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে খরচ তোলাই অসম্ভব। মহাস্থান হাটের আড়তদার তাহেরুল ইসলাম বলেন, বাজারে আমদানি বেশি হওয়ায় প্রতিদিনই দাম কমছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী—উভয়েই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এদিকে শিবগঞ্জ উপজেলার ১৭টি হিমাগারে এখনও বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রিত পড়ে আছে। দাম না থাকায় কৃষকরা আলু উত্তোলনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বগুড়ার কৃষকদের চোখে-মুখে এখন শুধুই হতাশা।



















