আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও সময়ের সংকটের ভিড়ে আজকাল অনেক বাবা-মা সন্তানের হাতে খুব সহজেই মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা টেলিভিশনের রিমোট তুলে দেন। শিশুকে শান্ত রাখা, খাওয়ানো বা নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করার এ যেন এক ‘সহজ সমাধান’। কিন্তু এই স্বস্তি যে পরবর্তীতে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা : শিশুর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছরই মস্তিষ্ক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় তারা শিখে চারপাশের মানুষ, প্রকৃতি, শব্দ ও অঙ্গভঙ্গি থেকে। কিন্তু মোবাইলের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিজ্যুয়াল, ঝলমলে আলো আর আকর্ষণীয় অ্যানিমেশনের কারণে শিশুর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি ভবিষ্যতে মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত চঞ্চলতা কিংবা শিক্ষাগত সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়।
শিশুদের হাতে মোবাইল ডিভাইস: স্বস্তির পথ, ভবিষ্যতের বিপদ
ভাষা শেখায় ধীরগতি: শিশুরা সাধারণত কথা বলা শেখে পরিবারের সদস্য বা আশেপাশের মানুষের মুখের শব্দ ও অভিব্যক্তি দেখে। কিন্তু যখন তারা নিয়মিত স্ক্রিনে ডুবে থাকে, তখন বাস্তব যোগাযোগের সুযোগ হারায়। এর ফলে ভাষা শেখার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, বাক্য গঠনে জটিলতা তৈরি হয় এবং সামাজিকভাবে প্রকাশের ক্ষমতা কমে যায়।
চোখ ও শরীরের ক্ষতি: লম্বা সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে শিশুর চোখে চাপ পড়ে। এতে চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, ঝাপসা দেখা দেয় এবং কম বয়সেই মাইনাস পাওয়ারের সমস্যা দেখা দেয়। অন্যদিকে, মোবাইল ব্যবহার শিশুদের শরীরচর্চা ও খেলাধুলার সময় কমিয়ে দেয়। মাঠে খেলার পরিবর্তে তারা বসে থাকে স্ক্রিনের সামনে। এতে ওজন বাড়ে, শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট জমে এবং ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা বা স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিশুদের হাতে মোবাইল ডিভাইস: স্বস্তির পথ, ভবিষ্যতের বিপদ
আসক্তির ফাঁদ: শিশুকে যখন ডিভাইস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন অনেকেই চিৎকার, রাগ বা আক্রমণাত্মক আচরণ করে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে আসক্তির লক্ষণ বলে অভিহিত করেছেন। দিনের পর দিন মোবাইল হাতে থাকলে শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। এর পাশাপাশি মোবাইল স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শিশুরা গভীর ঘুম পায় না, সকালে ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগহীনতায় ভোগে।
সামাজিক দক্ষতার অভাব : একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে মিশে থাকা, খেলা করা, সহানুভূতি প্রকাশ ও সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে। কিন্তু স্ক্রিনে আটকে থাকা শিশুরা বাস্তব জীবনের সামাজিক গুণাবলি শেখার সুযোগ হারায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের যোগাযোগ দক্ষতা ও সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিশুদের হাতে মোবাইল ডিভাইস: স্বস্তির পথ, ভবিষ্যতের বিপদ
সমাধান কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছরের নিচে শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম একেবারেই নিষিদ্ধ। আর ২–৫ বছর বয়সীদের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম অনুমোদিত, সেটিও অবশ্যই অভিভাবকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে।
বাবা-মাকে সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার বদলে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। গল্প বলা, ছবি আঁকা, ব্লক খেলনা দিয়ে খেলা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করার মতো উপায়গুলো শিশুকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তার জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়: শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়াটা হয়তো মুহূর্তের জন্য বাবা-মাকে স্বস্তি দেয়, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে তার ভবিষ্যৎ বিকাশের বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি সুস্থ, পরিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে আজ থেকেই সচেতন হতে হবে। কারণ শিশুর শৈশবের ছোট ছোট অভ্যাসই গড়ে দেয় তার আগামী জীবন।