রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থায় টিকিট জালিয়াতি: বিমানে ভয়ংকর কারসাজির নগ্ন চিত্র
- আপডেট সময় : ১১:০১:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৮ বার পড়া হয়েছে
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে ঘিরে উন্মোচিত হয়েছে ভয়ংকর টিকিট জালিয়াতির এক সংগঠিত চক্র। যাত্রীসেবা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং দেশের ভাবমূর্তি ও নাগরিক আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। বিমানের নিজস্ব তদন্তে অন্তত ১০টি জালিয়াতি চক্র শনাক্ত হওয়া প্রমাণ করে, টিকিট কারসাজি ছিল পরিকল্পিত, সংঘবদ্ধ এবং সুদূরপ্রসারী।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রাজস্ব শাখার নিয়মিত মনিটরিংয়ে গত ২৩ ডিসেম্বর টিকিট ইস্যু ও পেমেন্ট প্যাটার্নে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। এর পরপরই গঠিত বিশেষ তদন্তদল যে তথ্য সামনে এনেছে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। তদন্তে দেখা যায়, কিছু ট্রাভেল এজেন্ট বিমানের আইটি সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অননুমোদিতভাবে টিকিট ইস্যু করছিল।
ভুয়া বা আংশিক তথ্য ব্যবহার করে টিকিট প্রথমে সংগ্রহ করা হতো, এরপর তিন থেকে চারবার হাতবদল করে চূড়ান্তভাবে যাত্রীর কাছে বিক্রি করা হতো অতিরিক্ত দামে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণ যাত্রী প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আর রাষ্ট্রীয় সংস্থা পড়েছে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির মুখে।
তদন্তে জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বন ভয়েজ ট্রাভেলস অ্যান্ড ওভারসিজ। তাদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সাব-এজেন্ট, গাইবান্ধাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান, ইডেন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস এবং ক্রিয়েটিভ ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মোট চারটি ট্রাভেল এজেন্সি ও ছয় ব্যক্তির আইএটিএ আইডি ও ইনভেন্টরি অ্যাকসেস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিমানের সঙ্গে সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে দেয়, জালিয়াতি ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের কাজ।
বিমানের রাজস্ব বিভাগ যথার্থভাবেই জানিয়েছে, এ ধরনের অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থার সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। সময়মতো এই জালিয়াতি ধরা না পড়লে বিমান আরও বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ত, এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে। জনসংযোগ বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু ট্রাভেল এজেন্সির ক্রেডিট কার্ড লেনদেনেও অনিয়ম পাওয়া গেছে, যা তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রশংসনীয় হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এতদিন এই জালিয়াতি কীভাবে চলল? নজরদারি দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ শিথিলতা এবং নীতিগত ফাঁকফোকরই কি এসব সিন্ডিকেটকে সুযোগ করে দিয়েছে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্বৃত্তায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকার টিকিট জালিয়াতির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রেখে নতুন অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করেছে এবং ১১টি অপরাধে ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিতের সুযোগ রেখেছে।
এখন সময় এসেছে এই আইন বাস্তবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ভয়ানক জালিয়াতি বন্ধ হবে না, এটাই বাস্তবতা।



















