রমনা কালিমন্দির বাংলাদেশ সফরের শুভ সমাপ্তি: রামনাথ কোবিন্দ
- আপডেট সময় : ১০:১১:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১ ২৭৭ বার পড়া হয়েছে
ছবি সংগৃহিত
‘রমনা কালিমন্দির মন্দির ভারত-বাংলাদেশের মানুষের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক,
ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বাংলাদেশে তিনদিনের সফর শেষে দিল্লী ফিরেছেন। এই সফর ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করেছেন রামনাথ। বুধবার তিনদিনের বাংলাদেশ পৌঁছেন। বিমান বন্দরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ স্বাগত জানান অতিথিকে। বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতিকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢাকার অদূরে সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যান। সেখানে গাছ চারাও রোপণ করেন রামনাথ কোবিন্দ। এরপর তিনি আসেন ঢাকার ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে। এখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করেন।
বিকালে হোটেলে তার সঙ্গে সাক্ষাতে করেন বাংলাদেরেশর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশ মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এসময় উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বাসভবন তথা বঙ্গভবনে যান এবং দুই রাষ্ট্রপতি আলোচনা করেন। পরে নৈশ্যভোজে যোগ দেন। সফরের দ্বিতীয় দিন ১৬ ডিসেম্বর ৫০তম বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে যোগ দেন। সন্ধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি যোগদান করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। এখানে তাকে ‘মুজিব চিরন্তন শ্রদ্ধাস্মারক’ প্রদান করা হয়েছে।
এই আয়োজনে ভারতের রাষ্ট্রপতি তার স্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন। তার দীর্ঘ বক্তৃতা ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের ভাষা, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি, শিক্ষা থেকে শুরু করে সকল কিছুই ওঠে এসেছে। রামনাথ কোবিন্দের এই ভাষণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে মুগদ্ধ করেছে।

সফরের তৃতীয় দিনে ভারতীয় সম্প্রদায় এবং ঢাকায় ভারতীয় প্রবাসীদের সংবর্ধনায় যোগ দেন রাষ্ট্রপতি। এখানে তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক ৫০তম বছরে ঢাকায় আসতে পেরে তিনি আনন্দিত। একজন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর সাথে দেখা করার আনন্দ ও সম্মানের পাশাপাশি, বাংলাদেশের জনগণের উষ্ণতা ও ভালবাসা আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়েছে। রমনা কালিমন্দির ভারত-বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক। রামনাথ কোবিন্দ বলেন, এটি আমার বাংলাদেশ সফরের একটি শুভ সমাপ্তি ঘোষণা।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, এখানে যোগ দেওয়ার ঠিক আগেই আমি ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দির থেকে ফিরেছি, যেখানে সংস্কারকৃত মন্দির উদ্বোধন করার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি একে মা কালীর আশীর্বাদ হিসেবে দেখি। বাংলাদেশ-ভারতের সরকার ও জনগণ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক ধ্বংসকৃত মন্দিরটি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। দখলদার বাহিনীর হাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত হয়।

কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকে, এটাই আমার প্রথম বিদেশ সফর। আমি এই সফরকে সবচেয়ে সঠিক বলে মনে করছি, কারণ আমার প্রথম বাংলাদেশ সফর এই বিশেষ বছরে ঘটছে, যখন আমরা যৌথভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছি। স্বৈরাচার থেকে স্বাধীনতা অর্জনে বাংলাদেশের জনগণের বিপুল ত্যাগের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য আপনাদের অদম্য সাহসিকতাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। এবং আমি আপনাদের ভারতীয় বন্ধুদের এবং ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আত্মত্যাগের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাই, যারা একটি নৈতিক কারণে তাদের প্রাণ দিয়েছিলেন।
ভারতীয়দের হৃদয়ে বাংলাদেশের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। আমাদের রয়েছে আত্মীয়তা, ভাগাভাগি করা ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রাচীন বন্ধনের উপর ভিত্তি করে রচিত এক অনন্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আমাদের সম্পর্ক দুই দেশের বিচক্ষণ নেতৃত্বের দ্বারা লালিত হচ্ছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শ্রদ্ধা নিবেদন করার সময় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জনগণ যে নৃশংসতা ও গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছিল এবং নৃশংস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের কথাগুলো আমার মনে পড়ছিল। আমি শ্রদ্ধা জানাই সেইসব হাজার হাজার নারীর প্রতি যাদের মর্যাদা লঙ্ঘন করা হয়েছিল এবং অসহায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি, শুধু সম্মানজনক জীবনযাপন করার আকাক্সক্ষা ছাড়া যাদের কোন দোষ ছিল না এবং যাদের নির্যাতিত করা ও হত্যা করা হয়েছিল। আজ যেমন আপনাদের দেশ এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে, তেমনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের লড়াই ন্যায়সঙ্গত ছিল। এই লড়াই ছিল মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার শক্তিকে পরাজিত করে অধিকারের শক্তির জয়।

রামনাথ কোবিন্দ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ভারতও এই প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধির সাক্ষী হয়েছে। আমাদের দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে সেটিও এই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের যৌথ গল্পে অবদান রেখেছে।
আমি আনন্দিত যে, উভয় দেশের নেতৃত্বই জানেন আমাদের প্রবৃদ্ধির গতিপথ পরস্পর সংযুক্ত এবং সম্পদ ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান হল টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র। দুই সরকার আমাদের অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলোকে শক্তিশালী ও মজবুত রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে। আমি এটা জেনে আনন্দিত যে, আমাদের উভয় পক্ষ আমাদের প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং পরিবেশ-বান্ধব করার জন্য দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমি সবুজ শক্তি এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিশাল সম্ভাবনা দেখছি।
ভুটান এবং নেপালের সাথে স্থল সীমানাও ভাগ করে নেয়া একটি দেশ হিসেবে ভারত এই সত্যটি সম্পর্কে সচেতন যে, একটি সুসংযুক্ত এবং উন্নত সমন্বিত উপ-অঞ্চল আমাদের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নমূলক আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই চেতনার আলোকে, ভারত বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে তার যাত্রায় সহায়তা করতে এবং বৃহত্তর সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অংশীদার হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি উভয় পক্ষের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে, বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং আমাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মধ্যে আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংযোগ নতুন উচ্চতায় নেয়ার জন্য এই সুযোগটি কাজে লাগাতে অনুরোধ করছি।
আমরা তরুণ জাতি হিসেবে ভাগ্যবান, যাদের উদ্যমী এবং সৃজনশীল জনগোষ্ঠি রয়েছে। তরুণরাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাদের অবশ্যই এই জনসংখ্যাগত সুফল কাজে লাগাতে হবে, যাতে করে এটি জাতি গঠনে অবদান রাখতে পারে। আমি এটা জেনে আনন্দিত যে, যুব বিনিময় এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি বিশ্বায়িত এই বিশ্বে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরিতে সহায়তা করবে।



















