ঢাকা ০৫:১০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ইরান পাল্টা আক্রমণে ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করার আহ্বান: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বছরে স্বর্ণে জাকাত বেড়েছে ২০ হাজার ৮১৩ টাকা অমর একুশে বইমেলায় পাপেট  শোতে মুখর  শিশুপ্রহর ২২৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহতর দাবি করেছে পাকিস্তান ঋণ মওকুফে কৃষকের স্বস্তি: বিশেষ দোয়ার আয়োজন বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর জেদ্দায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার: ওআইসি সম্মেলনের প্রান্তে ৫ দেশের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক শিগগিরই ১০ হাজার নতুন কনস্টেবল নিয়োগ দেবে পুলিশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষি ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত

ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ

ঋদি হক, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০২:৩২:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৪৭ বার পড়া হয়েছে

স্বর্ণালী চৌধুরী

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘চলমান জীবনের গল্প’ বই থেকে 

রাত বাড়ছিল। অচেনা পথ, অচেনা শহর। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, শীতের মৃদু কামড়। স্থানীয় সময় রাত দশটার দিকে আমরা নামলাম ভারতের আসাম রাজ্যের নিউ করিমগঞ্জ স্টেশনে। সঙ্গে সফরসঙ্গী হাবিব। প্ল্যাটফর্মে নেমেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা টের পেলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকার, দূরে কেবল স্টেশনের সিগন্যাল বাতির লাল-সবুজ ঝিলিক।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটোতে উঠলাম। পথের দু’ধারে আধো আলো-আঁধারি দোকানপাট, কোথাও বা চায়ের স্টলে শেষ রাতের আড্ডা। হোটেলে পৌঁছে ক্লান্ত শরীর যেন একটু আশ্রয় পেল। আগরতলায় থাকতেই হাবিবের এক বন্ধু বুকিং করে রেখেছিল, তাই ঝামেলা হয়নি। রাতের খাবার সেরে গভীর ঘুমে ডুবে গেলাম।

সকালে নাস্তা করে রওনা দিলাম শিলচরের উদ্দেশে। সময় প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম বরাক উপত্যকার সবুজ বিস্তার। কোথাও সরু নদী, কোথাও চা-বাগানের গাঢ় ছায়া। মনে হচ্ছিল, এই নীরব প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

শিলচরে পৌঁছে হোটেলে উঠতেই মন ভরে গেল। বিশাল ভিআইপি স্যুট, সবই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছে বন্ধু স্বর্ণালী চৌধুরী। তার এই আন্তরিকতায় একধরনের অস্বস্তি-জড়ানো কৃতজ্ঞতা জন্ম নিল। একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্য শিলচর রেলওয়ে স্টেশন।

শিলচর রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে পা রাখতেই বুকের ভেতর কেমন চাপা কাঁপুনি অনুভব করলাম। লাল রঙের স্টেশন ভবনটা যেন নিছক ইট-সিমেন্ট নয়, শহীদ ১১ জন ভাষা সৈনিকের  রক্তের স্মারক। বরাক উপত্যকার ইতিহাসে এই  দিনটি এক চিরন্তন ক্ষত।

স্বর্ণালী পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল, চোখে জল চিকচিক করছিল। সে বলল, জানো, এই মাটিতেই তারা রক্ত দিয়েছিল। শুধু মাতৃভাষার জন্য।

আমি নীরবে শুনছিলাম।

ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ
ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ

স্বর্ণালী বলতে শুরু করল, ১৯৬১ সালের ১৯ মে, বাংলা ভাষাকে আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। হঠাৎ পুলিশের গুলি। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন ১১ জন তরুণ-তরুণী। তাদের মধ্যে ছিলেন কমলা ভট্টাচার্য একজন নারী শহীদ। আরও ছিলেন কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুশীল সরকার, সুকমল পুরকায়স্থ, তরুণীচরণ ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল ও কুমুদরঞ্জন দাস।

নামগুলো উচ্চারণ করতে করতে স্বর্ণালীর গলা ভারী হয়ে এলো। সে চোখ মুছে নিল।

তাদের আত্মত্যাগের ফলেই বরাক উপত্যকায় অঅজ বাংলা ভাষার স্বাচ্ছন্দ প্রচলন।   প্রতি বছর ১৯ মে ভাষা শহীদ দিবস পালন হয়। কিন্তু বলো তো,  ৬৫ বছর পরও তারা কি তাদের প্রাপ্য সম্মান পেয়েছে?

তার প্রশ্নে যেন বাতাসও থমকে গেল।

আমি ভাবছিলাম ১৯৫২ সালের ঢাকার কথা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এর সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল, পুলিশের গুলি, আর রক্তে ভেসে যাওয়া পথ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, তাদের আত্মত্যাগেই তো বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছিল। পরে সেই ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি লাভ করে।

স্বর্ণালী বলল, দেখো, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু শিলচরের শহীদদের কথা কতজন জানে? আমি চাই, তাদের আত্মত্যাগের কথাও আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছাক। জাতিসংঘ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই এই দাবি।

তার চোখে তখন আগুন আর জল-দুটোই একসঙ্গে।

হোটেলে ফিরে আমরা মুখোমুখি বসেছিলাম। সুদৃশ্য অফিস কক্ষে চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। স্বর্ণালী বলছিল, আমি সাহিত্যচর্চা করি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি, সবই এই ভাষার জন্য। কিন্তু ভাষা শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না মিললে আমার ভেতরে একটা অপূর্ণতা থেকে যাবে।

তার কথায় কোনো রাজনৈতিক উচ্চকণ্ঠ ছিল না,  ছিল এক গভীর মানবিক আবেদন। সে বলল, মায়ের ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিল, তাদের স্বীকৃতি আদায় করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমি মৃত্যু পর্যন্ত এই দাবি জানিয়ে যাব।

তার এই দৃঢ়তায় আমি বিস্মিত হলাম। কত মানুষই তো ইতিহাস জানে, ক’জন স্বর্ণালী  মতো দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়?

পরদিন আবার গেলাম শহীদ বেদির সামনে। সেখানে ফুলের মালা, নীরব শ্রদ্ধা। কয়েকজন তরুণ ছবি তুলছিল। তাদের একজন বলল, আমরা জানি, কিন্তু বইয়ে খুব বেশি লেখা নেই। কথাটা শুনে বুকের ভেতর হালকা কষ্ট হল।

ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ
শিলচরের ১১ ভাষাসৈনিক

ইতিহাসের যে অংশ রক্তে লেখা, তা কি এত সহজে মুছে যায়?

স্বর্ণালী বলল, আমরা যদি না বলি, না লিখি, না দাবি করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে কীভাবে?

তার কথায় আমি যেন এক নতুন দায় অনুভব করলাম। লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, ভাষা শহীদদের গল্প বলা কি আমারও দায়িত্ব নয়?

শিলচরের আকাশে তখন নরম রোদ। লাল স্টেশন ভবনটা দূর থেকে ঝলমল করছিল। মনে হচ্ছিল, এই রঙ কেবল রং নয়, এক প্রতিজ্ঞার প্রতীক। রক্তের রঙ, ভালোবাসার রঙ, প্রতিবাদের রঙ।

বিদায়ের আগে স্বর্ণালী বলল, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়। আত্মপরিচয়ের জন্য যারা প্রাণ দেয়, তাদের স্বীকৃতি না দিয়ে আমরা নিজেদেরই ছোট করি।

ফিরতি পথে বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিলাম, ভাষা আন্দোলন কেবল ১৯৫২-তেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ঢেউ ছড়িয়ে আছে সীমান্ত পেরিয়ে, বরাক উপত্যকার শিলচরেও। সেখানে একদল তরুণ-তরুণী রক্ত দিয়ে লিখেছে বাংলা ভাষার অধিকার।

আর আজ, সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে এক নারী, স্বর্ণালী চৌধুরী-নিরলস লড়াই করে যাচ্ছেন। তার লড়াই অস্ত্রের নয়, মানবিকতার,  শ্লোগানের নয়, স্মৃতির, ঘৃণার নয়, ভালোবাসার।

রাতের অন্ধকারে যেমন স্টেশনের সিগন্যাল বাতি পথ দেখায়, তেমনি স্বর্ণালীর এই মানবিক যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বীকৃতি কেবল রাষ্ট্রের কাগজে নয়, মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয়।

ভাষা শহীদদের রক্ত বৃথা যায় না। যতদিন কেউ তাদের নাম উচ্চারণ করবে, যতদিন কেউ চোখ ভিজিয়ে বলবে মাতৃভাষা, ততদিন তারা বেঁচে থাকবেন।

আর স্বর্ণালী?

সে হয়তো একদিন ক্লান্ত হবে, কিন্তু থামবে না। কারণ তার লড়াই ব্যক্তিগত নয়, একটি ভাষার, একটি ইতিহাসের, একটি আত্মপরিচয়ের। এই মানবিক যুদ্ধই তাকে কালজয়ী করে রাখবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ

আপডেট সময় : ০২:৩২:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘চলমান জীবনের গল্প’ বই থেকে 

রাত বাড়ছিল। অচেনা পথ, অচেনা শহর। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, শীতের মৃদু কামড়। স্থানীয় সময় রাত দশটার দিকে আমরা নামলাম ভারতের আসাম রাজ্যের নিউ করিমগঞ্জ স্টেশনে। সঙ্গে সফরসঙ্গী হাবিব। প্ল্যাটফর্মে নেমেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা টের পেলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকার, দূরে কেবল স্টেশনের সিগন্যাল বাতির লাল-সবুজ ঝিলিক।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটোতে উঠলাম। পথের দু’ধারে আধো আলো-আঁধারি দোকানপাট, কোথাও বা চায়ের স্টলে শেষ রাতের আড্ডা। হোটেলে পৌঁছে ক্লান্ত শরীর যেন একটু আশ্রয় পেল। আগরতলায় থাকতেই হাবিবের এক বন্ধু বুকিং করে রেখেছিল, তাই ঝামেলা হয়নি। রাতের খাবার সেরে গভীর ঘুমে ডুবে গেলাম।

সকালে নাস্তা করে রওনা দিলাম শিলচরের উদ্দেশে। সময় প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম বরাক উপত্যকার সবুজ বিস্তার। কোথাও সরু নদী, কোথাও চা-বাগানের গাঢ় ছায়া। মনে হচ্ছিল, এই নীরব প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

শিলচরে পৌঁছে হোটেলে উঠতেই মন ভরে গেল। বিশাল ভিআইপি স্যুট, সবই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছে বন্ধু স্বর্ণালী চৌধুরী। তার এই আন্তরিকতায় একধরনের অস্বস্তি-জড়ানো কৃতজ্ঞতা জন্ম নিল। একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্য শিলচর রেলওয়ে স্টেশন।

শিলচর রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে পা রাখতেই বুকের ভেতর কেমন চাপা কাঁপুনি অনুভব করলাম। লাল রঙের স্টেশন ভবনটা যেন নিছক ইট-সিমেন্ট নয়, শহীদ ১১ জন ভাষা সৈনিকের  রক্তের স্মারক। বরাক উপত্যকার ইতিহাসে এই  দিনটি এক চিরন্তন ক্ষত।

স্বর্ণালী পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল, চোখে জল চিকচিক করছিল। সে বলল, জানো, এই মাটিতেই তারা রক্ত দিয়েছিল। শুধু মাতৃভাষার জন্য।

আমি নীরবে শুনছিলাম।

ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ
ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ

স্বর্ণালী বলতে শুরু করল, ১৯৬১ সালের ১৯ মে, বাংলা ভাষাকে আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। হঠাৎ পুলিশের গুলি। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন ১১ জন তরুণ-তরুণী। তাদের মধ্যে ছিলেন কমলা ভট্টাচার্য একজন নারী শহীদ। আরও ছিলেন কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুশীল সরকার, সুকমল পুরকায়স্থ, তরুণীচরণ ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল ও কুমুদরঞ্জন দাস।

নামগুলো উচ্চারণ করতে করতে স্বর্ণালীর গলা ভারী হয়ে এলো। সে চোখ মুছে নিল।

তাদের আত্মত্যাগের ফলেই বরাক উপত্যকায় অঅজ বাংলা ভাষার স্বাচ্ছন্দ প্রচলন।   প্রতি বছর ১৯ মে ভাষা শহীদ দিবস পালন হয়। কিন্তু বলো তো,  ৬৫ বছর পরও তারা কি তাদের প্রাপ্য সম্মান পেয়েছে?

তার প্রশ্নে যেন বাতাসও থমকে গেল।

আমি ভাবছিলাম ১৯৫২ সালের ঢাকার কথা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এর সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল, পুলিশের গুলি, আর রক্তে ভেসে যাওয়া পথ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, তাদের আত্মত্যাগেই তো বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছিল। পরে সেই ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি লাভ করে।

স্বর্ণালী বলল, দেখো, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু শিলচরের শহীদদের কথা কতজন জানে? আমি চাই, তাদের আত্মত্যাগের কথাও আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছাক। জাতিসংঘ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই এই দাবি।

তার চোখে তখন আগুন আর জল-দুটোই একসঙ্গে।

হোটেলে ফিরে আমরা মুখোমুখি বসেছিলাম। সুদৃশ্য অফিস কক্ষে চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। স্বর্ণালী বলছিল, আমি সাহিত্যচর্চা করি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি, সবই এই ভাষার জন্য। কিন্তু ভাষা শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না মিললে আমার ভেতরে একটা অপূর্ণতা থেকে যাবে।

তার কথায় কোনো রাজনৈতিক উচ্চকণ্ঠ ছিল না,  ছিল এক গভীর মানবিক আবেদন। সে বলল, মায়ের ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিল, তাদের স্বীকৃতি আদায় করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমি মৃত্যু পর্যন্ত এই দাবি জানিয়ে যাব।

তার এই দৃঢ়তায় আমি বিস্মিত হলাম। কত মানুষই তো ইতিহাস জানে, ক’জন স্বর্ণালী  মতো দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়?

পরদিন আবার গেলাম শহীদ বেদির সামনে। সেখানে ফুলের মালা, নীরব শ্রদ্ধা। কয়েকজন তরুণ ছবি তুলছিল। তাদের একজন বলল, আমরা জানি, কিন্তু বইয়ে খুব বেশি লেখা নেই। কথাটা শুনে বুকের ভেতর হালকা কষ্ট হল।

ভাষা শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ে স্বর্ণালীর মানবিক যুদ্ধ
শিলচরের ১১ ভাষাসৈনিক

ইতিহাসের যে অংশ রক্তে লেখা, তা কি এত সহজে মুছে যায়?

স্বর্ণালী বলল, আমরা যদি না বলি, না লিখি, না দাবি করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে কীভাবে?

তার কথায় আমি যেন এক নতুন দায় অনুভব করলাম। লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, ভাষা শহীদদের গল্প বলা কি আমারও দায়িত্ব নয়?

শিলচরের আকাশে তখন নরম রোদ। লাল স্টেশন ভবনটা দূর থেকে ঝলমল করছিল। মনে হচ্ছিল, এই রঙ কেবল রং নয়, এক প্রতিজ্ঞার প্রতীক। রক্তের রঙ, ভালোবাসার রঙ, প্রতিবাদের রঙ।

বিদায়ের আগে স্বর্ণালী বলল, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়। আত্মপরিচয়ের জন্য যারা প্রাণ দেয়, তাদের স্বীকৃতি না দিয়ে আমরা নিজেদেরই ছোট করি।

ফিরতি পথে বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিলাম, ভাষা আন্দোলন কেবল ১৯৫২-তেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ঢেউ ছড়িয়ে আছে সীমান্ত পেরিয়ে, বরাক উপত্যকার শিলচরেও। সেখানে একদল তরুণ-তরুণী রক্ত দিয়ে লিখেছে বাংলা ভাষার অধিকার।

আর আজ, সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে এক নারী, স্বর্ণালী চৌধুরী-নিরলস লড়াই করে যাচ্ছেন। তার লড়াই অস্ত্রের নয়, মানবিকতার,  শ্লোগানের নয়, স্মৃতির, ঘৃণার নয়, ভালোবাসার।

রাতের অন্ধকারে যেমন স্টেশনের সিগন্যাল বাতি পথ দেখায়, তেমনি স্বর্ণালীর এই মানবিক যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বীকৃতি কেবল রাষ্ট্রের কাগজে নয়, মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয়।

ভাষা শহীদদের রক্ত বৃথা যায় না। যতদিন কেউ তাদের নাম উচ্চারণ করবে, যতদিন কেউ চোখ ভিজিয়ে বলবে মাতৃভাষা, ততদিন তারা বেঁচে থাকবেন।

আর স্বর্ণালী?

সে হয়তো একদিন ক্লান্ত হবে, কিন্তু থামবে না। কারণ তার লড়াই ব্যক্তিগত নয়, একটি ভাষার, একটি ইতিহাসের, একটি আত্মপরিচয়ের। এই মানবিক যুদ্ধই তাকে কালজয়ী করে রাখবে।