ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক ও বহুমাত্রিক লেখক আহমদ রফিক পরলোকগমন করেছেন। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১২ মিনিটে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি ৯৭তম জন্মদিনে পা রাখেন।
আহমদ রফিককে প্রথমে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে চিকিৎসা চলতে থাকে। শারীরিক অবস্থা আরও অবনতির পর তাঁকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি নিবিড় পরিচর্যায় থাকার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বাংলা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ গবেষণা ও সাহিত্যচর্চা—সব ক্ষেত্রেই অনন্য অবদান রেখেছেন তিনি। কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসসহ তাঁর লিখিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসেবে দুই বাংলাতেই তাঁর প্রাপ্তি ও সম্মান সমানভাবে স্বীকৃত। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্রত্ত্বাচার্য উপাধিসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
জন্ম ও শৈশব
আহমদ রফিক ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনায় মেধাবী আহমদ রফিক প্রথমে মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। তবে ফজলুল হক হলের আবাসিক সুবিধা না পাওয়ায় পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ১৯৫২ সালে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হিসেবে ভাষা আন্দোলনের সময়ে ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ফজলুল হক হল, ঢাকা হল ও মিটফোর্ডের ছাত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৫৪ সালে আন্দোলনকারী ছাত্রদের মাঝে একমাত্র তাঁর বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ১৯৫৫ সালের শেষ দিকে তিনি আবার পড়াশোনায় ফেরেন এবং পরে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে চিকিৎসকের পেশায় আর প্রবেশ করেননি।
সাহিত্য ও গবেষণায় আজীবন নিমগ্ন‘
১৯৫৮ সালে তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ শিল্প সংস্কৃতি জীবন প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে তিনি আজীবন লেখালেখি ও গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণা তাঁকে ‘রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ’ হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে তাঁর বিস্তৃত কাজ নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে আছে।
জীবনের শেষদিকে চলনশক্তি ও দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়লেও তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। অনর্গল আলোচনা করতে পারতেন ইতিহাস, রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে। একঘেয়েমি কাটাতে শেষ বয়সে তিনি উপন্যাস লেখার চেষ্টাও শুরু করেছিলেন।
ভাষাসংগ্রামী ও সাহিত্যি-গবেষক আহমদ রফিকের চিরবিদায়
ব্যক্তিজীবন
আহমদ রফিক ছিলেন নিঃসন্তান। ২০০৬ সালে তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে একাকিত্বে দিন কাটাতেন তিনি। নিকটজন ও সহযাত্রীদের অনেকেই তাঁকে উপেক্ষা করলেও জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ রাখেননি। চলনশক্তিহীন অবস্থায়ও তিনি মানুষের সঙ্গ কামনা করতেন। আলোচনায় জড়িয়ে পড়তে চাইতেন ইতিহাস, সাহিত্য বা রাজনীতি নিয়ে। আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ করার জন্য ফাউন্ডেশন গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন কয়েক মাস আগেও।
আহমদ রফিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “ভাষা আন্দোলনে আহমদ রফিকের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাঁর শতাধিক গ্রন্থ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।”
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীও এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, “আহমদ রফিক আজীবন অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার পক্ষে লড়াই করে গেছেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের এক সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম মানবমুক্তির লড়াইয়ে আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।”
নিঃসঙ্গতার ভারে নুয়ে পড়লেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লেখালেখি ও গবেষণার প্রতি অটল ছিলেন আহমদ রফিক। তাঁর জীবন কেবল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নয়, বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করেছে। আজ তিনি না থাকলেও তাঁর লেখা, গবেষণা এবং আদর্শ বেঁচে থাকবে আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে।