ভালো নেই সুন্দরবনের বাঘ- হরিণ: চোরা শিকার, ফাঁদ আর নীরব সংকট
- আপডেট সময় : ০৬:৫৩:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন–বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এই বনের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং বনজ জীবনের ভারসাম্যের প্রধান ভিত্তি চিত্রল ও মায়া হরিণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব ক্রমেই চোরা শিকারি, পাচারকারী এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মুখে হুমকির মধ্যে পড়ছে।
শীত মৌসুম এলেই সুন্দরবনের ভেতরের খালগুলোতে পানি কমে আসে। এর সুযোগ নেয় চোরা শিকারিরা। পানি শুকিয়ে গেলে হরিণের পাল বন থেকে লোকালয়ের দিকে চলে আসে, আবার স্থানীয় কিছু মানুষ সহজেই বনের ভেতরে ঢুকে ফাঁদ পেতে শিকার শুরু করে। এসব ফাঁদ শুধু হরিণের জন্য নয়, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এতে আটকে পড়ছে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীও।
গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী টহল ফাঁড়ি এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ছিটকে ফাঁদে আটকে পড়ে একটি স্ত্রী বাঘ। বন বিভাগের কর্মীরা ট্রানকুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘটিকে অচেতন করে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করেন। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খুলনার বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টারে নেওয়া হয় বাঘটিকে, যেখানে সে এখনও চিকিৎসাধীন। একই এলাকায় পরবর্তী তল্লাশিতে একাধিক ফাঁদ উদ্ধার করা হয়, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও ২০০৭, ২০০৯ ও ২০১৪ সালে হরিণ শিকারিদের ফাঁদে পড়ে বাঘের পা কিংবা হাত হারানোর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সংকট।

হরিণ শিকারের সঙ্গে জড়িতদের বড় অংশই সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। তারা বনে ঢুকে ফাঁদ পেতে বা গুলি করে হরিণ শিকার করে এবং পরে মাংস, মাথা ও শিং স্থানীয় বাজারে কিংবা গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রি করে। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে শিকারি আটক হলেও অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এ শিকার ও পাচার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীরাও সক্রিয়।
পরিসংখ্যান বলছে, গত একযুগে সুন্দরবন থেকে এক লাখের বেশি ফুট মালা ফাঁদ, অসংখ্য আগ্নেয়াস্ত্র, স্পিডবোট ও নৌযান উদ্ধার করা হয়েছে। তবু চোরা শিকার থামছে না। বনদস্যুদের পাশাপাশি কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশও এই অপরাধকে দীর্ঘস্থায়ী করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আশার কথা, বাঘ ও হরিণের সংখ্যা পরিসংখ্যানে এখনো কিছুটা ইতিবাচক চিত্র দেখা যায়। ২০২৪ সালের সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা পাওয়া গেছে ১২৫টি, যা আগের জরিপের তুলনায় বেড়েছে। একইভাবে আইইউসিএনের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই অগ্রগতি টেকসই হবে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক এম এ আজিজের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় প্রথম কাজ হলো বনদস্যু ও পেশাদার শিকারিদের নির্মূল করা। বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ, অবৈধ ফাঁদ উচ্ছেদ, বন বিভাগের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান জরুরি।

বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকটি বিষয়ে তাৎক্ষণিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সুন্দরবনের ভেতরে ও আশপাশে নিয়মিত যৌথ টহল ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণে অংশীদার করে বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা শিকারে না জড়ায়। তৃতীয়ত, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিকারিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। চতুর্থত, বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণ শুধু বন্যপ্রাণী নয়, এরা বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের অংশ। তাদের সুরক্ষা মানে বন রক্ষা, বন রক্ষা মানে উপকূলীয় মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে পরিসংখ্যানের ইতিবাচক সংখ্যা কাগজেই থেকে যাবে, বাস্তবে সুন্দরবনের নীরব আর্তনাদ আরও গভীর হবে।




















