বিনিয়োগ সংকটে অর্থনীতি, এডিপি বাস্তবায়ন ১০ বছরে সর্বনিম্নে
- আপডেট সময় : ০১:৪১:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগও ঐতিহাসিকভাবে নিম্নস্তরে অবস্থান করছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনি বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক গতি মন্থর হয়ে পড়েছে এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়াই বর্তমানে সবচেয়ে বড় ও প্রধান সমস্যা।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে যায়, বাড়ে বেকারত্ব এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্বস্তি তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হচ্ছে এর বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম চাপে ফেলছে। বিশ্ববাজারে চাল ও আটার দাম কমলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ছে না, যা বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে।
ব্যাংক খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ঋণখেলাপি সমস্যা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এই খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, তা নির্বাচিত সরকারকেও অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংক একীভূত বা বন্ধ করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব আদায়ে নতুন পথ খুঁজতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বাতিল, করদাতাদের উৎসাহ দেওয়া এবং অবৈধ অর্থপাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখন একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে এই সংকট সমাধান করা যাবে না। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কার, মজুতদারি রোধ, পরিবহন ও সংরক্ষণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সময়োপযোগী আমদানি সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য।
সিপিডির মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নীতি ধারাবাহিকতা, সুশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার সুযোগও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ বর্তমানে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির এক মিশ্র বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাহসী সংস্কার, কার্যকর নীতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অর্থনীতির হারানো গতি আবারও ফিরে আসতে পারে, এমনটাই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।



















