ফ্যামিলি কার্ড থেকে রাষ্ট্র সংস্কার পাঁচ অধ্যায়ে বিএনপির ইশতেহার, নতুন সামাজিক চুক্তির ঘোষণা
- আপডেট সময় : ০৫:২০:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচ অধ্যায়ে বিভক্ত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার থেকে শুরু করে অর্থনীতি পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা ও অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন, সব মিলিয়ে এটিকে জনগণের সঙ্গে একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে দলটি।
শুক্রবার বিকেলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, মানবিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণসহ নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিএনপির ভাষায়, এই ইশতেহারের মূল দর্শন হলো, ক্ষমতা নয় জনগণের অধিকার, ভয় নয় ন্যায়, লুটপাট নয় উৎপাদন।
রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ, সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশ সংস্কার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে। জাতীয় ঐক্য ও সুশাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈষম্যহীন উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা
দ্বিতীয় অধ্যায়ে দারিদ্র্য নিরসন ও বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক–সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নারী ক্ষমতায়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিক ও প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতির পুনর্গঠন
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তৃতীয় অধ্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার, শিল্প ও সেবা খাত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন
চতুর্থ অধ্যায়ে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা নির্মাণ এবং পর্যটন খাত সম্প্রসারণের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি
পঞ্চম অধ্যায়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পাহাড় ও সমতলের জনগোষ্ঠীর অধিকার, ক্রীড়া উন্নয়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা এবং নৈতিকতার পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে ঘোষিত নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে:
- প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য সরবরাহ
- কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’, ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও কৃষি বীমা
- মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
- আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার ও মিড-ডে মিল চালু
- তরুণদের কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ সহায়তা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ
- ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা–উপজেলায় অবকাঠামো সম্প্রসারণ
- ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খাল খনন, ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- ধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদারে সব ধর্মের উপাসনালয়ের নেতাদের কল্যাণ ব্যবস্থা
- ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পেপাল চালু, ই-কমার্স হাব ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ রপ্তানি সম্প্রসারণ
রাজনীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা
বিএনপির দাবি, এই ইশতেহার ক্ষমতার রাজনীতির নয়, বরং জনগণের অধিকার, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতির ঘোষণা। প্রতিশোধ নয়—ন্যায়; ভয় নয়—অধিকার; লুটপাট নয়—উৎপাদন—এই নীতির ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের কাছে এই ইশতেহার কতটা আস্থা তৈরি করতে পারে, সেটিই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।


















