পৃথিবীর নরক’খ্যাত কারাগারে মাদুরো: আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিতে নতুন সংকট
- আপডেট সময় : ০৪:২৯:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬ ৯১ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত কুখ্যাত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার (এমডিসি) যাকে অনেক আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ‘পৃথিবীর নরক’ বলে অভিহিত করেন, সেই কারাগারেই এখন বন্দি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতে নজিরবিহীন এক অভিযানের পর তাকে সেখানে রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সরাসরি অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে। এই অভিযানকে বিশ্লেষকেরা সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম আগ্রাসী ও নজিরবিহীন সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আটক হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাদুরোকে প্রথমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ইউ জিমা, পরে কিউবার গুয়ানতানামো নৌঘাঁটি হয়ে নিউইয়র্কে আনা হয়।

নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রকাশিত এক ভিডিওতে হাতকড়া পরা অবস্থায় মাদুরোকে দুই মাদকবিরোধী এজেন্টের পাহারায় হাঁটতে দেখা যায়। ওই ভিডিওতে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তাকে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) হেফাজতে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ব্রুকলিনের এমডিসিতে পাঠানো হয়।
মার্কিন বিচারব্যবস্থার আওতায় মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদের’ মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে এমডিসিতেই রাখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই কারাগারে বন্দি রয়েছেন তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও।
এমডিসি এমন একটি কারাগার, যার অবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা চলছে। এক হাজার বন্দির জন্য নির্মিত এই কেন্দ্রে অতীতে দেড় হাজারের বেশি বন্দি রাখা হয়েছে। বর্তমানে এখানে ১ হাজার ৩৩৬ জন বন্দি রয়েছে বলে ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস জানিয়েছে।
জনবলের মারাত্মক ঘাটতি, অতিরিক্ত বন্দি ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো এই কারাগারকে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

২০১৯ সালে বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে শীতের মধ্যে কয়েক দিন ধরে বন্দিরা কোনো গরমের ব্যবস্থা ছাড়াই থাকতে বাধ্য হন। সে সময় নিউইয়র্কের তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এমডিসির পরিস্থিতিকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁর ভাষায়, কারাবন্দি হওয়া মানে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়।
আইনজীবী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তারাও এমডিসিকে জীবন্ত নরক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চিকিৎসা সেবার অভাব, স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন, খাবারের মানহানি এবং কয়েদিদের মধ্যে সহিংসতা—সব মিলিয়ে এই কারাগার এক গভীর মানবিক সংকটের প্রতীক। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত চারজন বন্দির আত্মহত্যার ঘটনাও সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে।
এমন এক বন্দিশিবিরে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে আটকের ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের প্রশ্নে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে এমডিসিতে রাখা শুধু একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের এক স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা, যার প্রভাব বৈশ্বিক কূটনীতিতে দীর্ঘদিন অনুভূত হবে।


















