ঢাকা ০৬:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাঘ-হাতি শিকারে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা নির্বাচনী মাঠে এখনো সমান সুযোগ, সম্প্রীতির বাংলাদেশই লক্ষ্য: প্রেস সচিব ইসলামী ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে টেকসই উন্নয়ন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সূচনা মাদুরোর নজির টেনে কাদিরভের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আহ্বান জেলেনস্কির এবার পাতানো নির্বাচন হবে না: কড়া বার্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনের মোদিকে শায়েস্তা করতে ট্রাম্পের কড়া পদক্ষেপ? ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি ৭ লাখ ২৮ হাজার প্রবাসীদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে ইসি এলপিজি ঘিরে নীরব অর্থনৈতিক সন্ত্রাসে জিম্মি ভোক্তা, কঠোর পদক্ষেপের দাবি ইসমত শিল্পীর কবিতা ‘অশ্রুবাষ্প’ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতিতে বাংলাদেশ: সর্বোচ্চ গুণতে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত শিল্পী আর সন্ধ্যার গল্প

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৩:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬ ১৩৮ বার পড়া হয়েছে

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা: ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শীতের মহাজন তখনও ঝাকিয়ে বসেনি। হাল্কা, যাকে বলে-নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। প্লাষ্টিকের টুলে মুখোমুখি বসে চায়ের সঙ্গে আলাপ বেশ জমে ওঠেছে। প্রগতিশীল চিন্তার পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠেছেন। মুক্ত চিন্তার মানুষ হওয়ায় আলাপে গতি পায়। আলাপের শুরুতেই মনে হয়েছিল, তিনি যেন বহুকালের চেনা এক সহমর্মী বন্ধু, যার সঙ্গে নতুন করে পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। শব্দের ফাঁকেই যার আত্মীয়তা ধরা দেয়, আর নীরবতার মধ্যেও বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়ে যায়। সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়ার তার নিবাস। লালনের সঙ্গে দেখা করতে আমায় নিয়ে যাবার কথা দেন সাংকৃতিক ভুবনের এই বাসিন্দা।  না, শুধু লালন নয়, কাঙ্গাল তথা বাউল হরিনাথের ভিটেও ঘুরে আসবো। কিন্তু গগন? হ্যাঁ তার কাছেও যাবো। সম্মতি জানান তিনি।

হাতে বল্লম-হারিকেন আর পিঠে চাপানো মানি অর্ডার-চিঠি ভর্তি ব্যাগ। খাকি রঙের চার পকেটযুক্ত সার্টের পকেটে টাকা। দায়িত্বশীলি এই ব্যক্তি কুষ্টিয়ার কুমারখালির নানা পথে ছুটে চলেছেন। তার বল্লমের আগায় ঘুঙুর বাধা। দূর থেকে বোঝা যায়, ঐ আসছে ডাক বাবু। অনেক বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে ওঠুনে এসে হাক দেন-চিঠি-মানি অর্ডার। আঁচলে মুখ ঢেকে কোন কোন বাড়ির লাজুক গৃহবধূ বেড়িয়ে আসেন। তার মনে তখন ঝড় বয়ে যায়। এই বুঝি এলো তার মনের মানুষের লেখা কাঙ্খি চিঠি। কাঁপা হাতে চিঠি নিয়ে এক মুহূর্তো না দাড়িয়ে ছুটে যায় ঘরে। গগন তাকিয়ে তাকিয়ে জোরে নিঃশ্বাস ফেলেন, তার কষ্ট সার্থক হয়েছে।

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা: ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
ইসমত শিল্পী

এমনি ভাবে প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করে যান গগন। কুমারখালির মাটির রাস্তা ধরে ক্লান্ত শরীর টেনে ঘরের পথে পা বাড়ান গগন। এক সময় বড় ছায়া গাছের গোড়ায় দেহখানা এলিয়ে দিয়ে বসেন। বিকেলের মিষ্টিরোদ আর মেঘমুক্ত আকাশ। অজান্তেই গগনের কণ্ঠে সুর ওঠে ‘আমি কোথায়  পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’’। গগনের মায়াবি সুরে থেমে যায় পাখির চলাচল। মোলায়েম বাতাস গগনের ক্লান্তি দূর করে দেয় আলতো পরশে। গগনের গানের সুরে পথ চলা মানুষকেও থামিয়ে দেয়। হঠাৎ একজন তার সুরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মোলায়েম কণ্ঠে বলেন, আচ্ছা গগন বাবু আপনার এই গানের সুরে আমি একটি গান তৈরি করতে চাই। আপনার এই অভূতপূর্ব সুর আমায় ব্যবহার করতে দেবেন?

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
সাহিত্যিক ইসমত শিল্পী

উদার আকাশের মতো হাসলেন গগন, যে গগন দায়িত্বশীল। মানুষের আকাঙ্খাকে বিলি করে ফেরেন। সেই গগনের জন্ম বিলিয়ে দেওয়া। সেখানে এই সুর বিলিয়ে দেওয়াতো নস্যি, ভাবলেন গগন, পরমুহূর্তে অনুমতি দিলেন। গগনের সেই কালজয়ী সুরেই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। যা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত।

সেই উদার মানুষটির নাম গগন হরকরা। কুষ্টিয়া শহরের কেন্দ্রস্থলে তার মূর্তি রয়েছে। ব্যাকুল হয়ে বললাম গগন হরকরার সঙ্গেও একবার দেখা হবে। সম্ভব হলে তার ভিটেয় গিয়ে দু’দন্ড বসে আসবো। আমার এই দাবির প্রতি একমত পোষণ করে  স্মিত হাসলেন, তারপর স্মিত হেসে বল্লেন অবশ্যই নিয়ে যাবো।

গগন হরকরা তথা গগন চন্দ্র দাস বাংলা লোকসঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত রচয়িতা ও বিশিষ্ট বাউল গীতিকার।  এই মহান মানুষটি বাংলাদেশের শিলাইদহের  আড়পাড়া গ্রামে। পেশা ছিল শিলাইদহ ডাকঘরে চিঠি বিলি করা। রবীন্দ্রনাথ তার গুণমুগ্ধ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা’  গান দুটি গগন হরকরার যথাক্রমে ‘ও মন অসাড় মায়ায় ভুলে রবে’ এবং ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গান দুটির সুর ভেঙ্গে রচিত হয়।

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প

ইসমত শিল্পী একাধারে লেখক, সমাজসেবক, সংগঠক ও সাংকৃতিক পরিমন্ডলের বাসিন্দা। বল্লেন, বাবা ছিলেন প্রগতিশীলি চিন্তার মানুষ। সাহিত্য-সাংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়নে একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গড়ার চিন্তক। মাও তাকে গান, লেখালেখি আর অভিনয়ে উৎসাহ দিতেন। এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ইসমতের এ পর্যন্ত ২০টি বই প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও বাংলা একাডেমির সদস্য। সকালে তার ঘুম ভাঙ্গে কাজের তাড়নায়। চলনে-বলনে আধুনি, রুচিশীল।

মুক্ত  চিন্তার এই ব্যক্তিত্ব  পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কিছু করতে চান। অনেকটা নিরবেই কাজ করে চলেছেন শিল্পী। আলাপের এক ফাঁকে দীর্ঘ নিঃশ্বাষ ছেড়ে নিজেকে অনেকটা হাল্কা করে নিয়ে বললেন, মায়ের জন্য খুব কষ্ট হয়। মা গত হবার পর ইসমত বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বাভাবিক হতে অনেকটা সময় লাগে যায়।

সাহিত্যাঙ্গণে গবেষণা কেমন হচ্ছে, প্রশ্নটি শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে যান ভাবজগতের এই বাসিন্দা। চোখের দৃষ্টিতে জমে ওঠে দীর্ঘ পাঠ ও অভিজ্ঞতার ছাপ। তারপর ধীর স্বরে বলেন, তথ্য যা বলছে, তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গণে গবেষণার পরিমাণ ও গভীরতা এখনও প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছায়নি। যেসব গবেষণা হয়েছে, তার বড় অংশই তথ্যনির্ভর; সেখানে বিশ্লেষণের গভীরতা, নান্দনিক পাঠ কিংবা সমালোচনামূলক অনুধ্যানের ঘাটতি স্পষ্ট।

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প

যে কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চায় আমরা এক ধরনের মিশ্র চিত্র দেখি, কোথাও সাফল্যের দীপ্তি, কোথাও অপূর্ণতার ছায়া। গবেষণার স্বল্পতা সাহিত্যকে অনেক সময় তাৎক্ষণিক সৃজনে সীমাবদ্ধ করে রাখে, দীর্ঘমেয়াদি বোধ ও দৃষ্টির প্রসার ঘটাতে পারে না। ইসমত শিল্পীর মতে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব কেবল মানসম্মত গবেষণার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলা সম্ভব হলে। নতুন গবেষকদের সাহস দেওয়া, তাদের চিন্তাকে মুক্ত পরিসর দেওয়া এবং সর্বোপরি গবেষণার প্রতি সামগ্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোই পারে সাহিত্যাঙ্গণকে নতুন গভীরতা ও পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে।

কর্মব্যস্ত দিনের ভিড়ে লেখাটির তৈরিতে একটু সময় লেগে গেলো। ইসমতের সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই ভাবনায় তার রেখাপাত ছিল, শব্দগুলো মনে মনে গুছিয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু সময়ের স্রোতে রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ সামনে এসে দাঁড়ানোয় সেই ভাবনাকে কাগজে নামাতে বিলম্ব হলো। তবু ভালো লাগছে, নতুন বছরের শুরুতেই বন্ধুর জন্য লেখাটি সম্পন্ন করতে পেরে।

এই লেখার পেছনে ইসমতের যে সহায়তা ও নিঃশর্ত আস্থা ছিল, তার জন্য রইল অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। নতুন বছরে ইসমত শিল্পীর কলমে আসুক আরও দৃঢ়তা, চিন্তার পরিসরে জন্ম নিক আরও গভীর ও প্রখর বোধ, আর জীবনের পথে নেমে আসুক প্রশান্তি ও সাফল্যের নির্ভার আলো।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত শিল্পী আর সন্ধ্যার গল্প

আপডেট সময় : ০৪:৫৩:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

শীতের মহাজন তখনও ঝাকিয়ে বসেনি। হাল্কা, যাকে বলে-নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। প্লাষ্টিকের টুলে মুখোমুখি বসে চায়ের সঙ্গে আলাপ বেশ জমে ওঠেছে। প্রগতিশীল চিন্তার পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠেছেন। মুক্ত চিন্তার মানুষ হওয়ায় আলাপে গতি পায়। আলাপের শুরুতেই মনে হয়েছিল, তিনি যেন বহুকালের চেনা এক সহমর্মী বন্ধু, যার সঙ্গে নতুন করে পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। শব্দের ফাঁকেই যার আত্মীয়তা ধরা দেয়, আর নীরবতার মধ্যেও বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়ে যায়। সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়ার তার নিবাস। লালনের সঙ্গে দেখা করতে আমায় নিয়ে যাবার কথা দেন সাংকৃতিক ভুবনের এই বাসিন্দা।  না, শুধু লালন নয়, কাঙ্গাল তথা বাউল হরিনাথের ভিটেও ঘুরে আসবো। কিন্তু গগন? হ্যাঁ তার কাছেও যাবো। সম্মতি জানান তিনি।

হাতে বল্লম-হারিকেন আর পিঠে চাপানো মানি অর্ডার-চিঠি ভর্তি ব্যাগ। খাকি রঙের চার পকেটযুক্ত সার্টের পকেটে টাকা। দায়িত্বশীলি এই ব্যক্তি কুষ্টিয়ার কুমারখালির নানা পথে ছুটে চলেছেন। তার বল্লমের আগায় ঘুঙুর বাধা। দূর থেকে বোঝা যায়, ঐ আসছে ডাক বাবু। অনেক বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে ওঠুনে এসে হাক দেন-চিঠি-মানি অর্ডার। আঁচলে মুখ ঢেকে কোন কোন বাড়ির লাজুক গৃহবধূ বেড়িয়ে আসেন। তার মনে তখন ঝড় বয়ে যায়। এই বুঝি এলো তার মনের মানুষের লেখা কাঙ্খি চিঠি। কাঁপা হাতে চিঠি নিয়ে এক মুহূর্তো না দাড়িয়ে ছুটে যায় ঘরে। গগন তাকিয়ে তাকিয়ে জোরে নিঃশ্বাস ফেলেন, তার কষ্ট সার্থক হয়েছে।

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা: ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
ইসমত শিল্পী

এমনি ভাবে প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করে যান গগন। কুমারখালির মাটির রাস্তা ধরে ক্লান্ত শরীর টেনে ঘরের পথে পা বাড়ান গগন। এক সময় বড় ছায়া গাছের গোড়ায় দেহখানা এলিয়ে দিয়ে বসেন। বিকেলের মিষ্টিরোদ আর মেঘমুক্ত আকাশ। অজান্তেই গগনের কণ্ঠে সুর ওঠে ‘আমি কোথায়  পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’’। গগনের মায়াবি সুরে থেমে যায় পাখির চলাচল। মোলায়েম বাতাস গগনের ক্লান্তি দূর করে দেয় আলতো পরশে। গগনের গানের সুরে পথ চলা মানুষকেও থামিয়ে দেয়। হঠাৎ একজন তার সুরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মোলায়েম কণ্ঠে বলেন, আচ্ছা গগন বাবু আপনার এই গানের সুরে আমি একটি গান তৈরি করতে চাই। আপনার এই অভূতপূর্ব সুর আমায় ব্যবহার করতে দেবেন?

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
সাহিত্যিক ইসমত শিল্পী

উদার আকাশের মতো হাসলেন গগন, যে গগন দায়িত্বশীল। মানুষের আকাঙ্খাকে বিলি করে ফেরেন। সেই গগনের জন্ম বিলিয়ে দেওয়া। সেখানে এই সুর বিলিয়ে দেওয়াতো নস্যি, ভাবলেন গগন, পরমুহূর্তে অনুমতি দিলেন। গগনের সেই কালজয়ী সুরেই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। যা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত।

সেই উদার মানুষটির নাম গগন হরকরা। কুষ্টিয়া শহরের কেন্দ্রস্থলে তার মূর্তি রয়েছে। ব্যাকুল হয়ে বললাম গগন হরকরার সঙ্গেও একবার দেখা হবে। সম্ভব হলে তার ভিটেয় গিয়ে দু’দন্ড বসে আসবো। আমার এই দাবির প্রতি একমত পোষণ করে  স্মিত হাসলেন, তারপর স্মিত হেসে বল্লেন অবশ্যই নিয়ে যাবো।

গগন হরকরা তথা গগন চন্দ্র দাস বাংলা লোকসঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত রচয়িতা ও বিশিষ্ট বাউল গীতিকার।  এই মহান মানুষটি বাংলাদেশের শিলাইদহের  আড়পাড়া গ্রামে। পেশা ছিল শিলাইদহ ডাকঘরে চিঠি বিলি করা। রবীন্দ্রনাথ তার গুণমুগ্ধ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা’  গান দুটি গগন হরকরার যথাক্রমে ‘ও মন অসাড় মায়ায় ভুলে রবে’ এবং ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গান দুটির সুর ভেঙ্গে রচিত হয়।

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প

ইসমত শিল্পী একাধারে লেখক, সমাজসেবক, সংগঠক ও সাংকৃতিক পরিমন্ডলের বাসিন্দা। বল্লেন, বাবা ছিলেন প্রগতিশীলি চিন্তার মানুষ। সাহিত্য-সাংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়নে একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গড়ার চিন্তক। মাও তাকে গান, লেখালেখি আর অভিনয়ে উৎসাহ দিতেন। এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ইসমতের এ পর্যন্ত ২০টি বই প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও বাংলা একাডেমির সদস্য। সকালে তার ঘুম ভাঙ্গে কাজের তাড়নায়। চলনে-বলনে আধুনি, রুচিশীল।

মুক্ত  চিন্তার এই ব্যক্তিত্ব  পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কিছু করতে চান। অনেকটা নিরবেই কাজ করে চলেছেন শিল্পী। আলাপের এক ফাঁকে দীর্ঘ নিঃশ্বাষ ছেড়ে নিজেকে অনেকটা হাল্কা করে নিয়ে বললেন, মায়ের জন্য খুব কষ্ট হয়। মা গত হবার পর ইসমত বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বাভাবিক হতে অনেকটা সময় লাগে যায়।

সাহিত্যাঙ্গণে গবেষণা কেমন হচ্ছে, প্রশ্নটি শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে যান ভাবজগতের এই বাসিন্দা। চোখের দৃষ্টিতে জমে ওঠে দীর্ঘ পাঠ ও অভিজ্ঞতার ছাপ। তারপর ধীর স্বরে বলেন, তথ্য যা বলছে, তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গণে গবেষণার পরিমাণ ও গভীরতা এখনও প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছায়নি। যেসব গবেষণা হয়েছে, তার বড় অংশই তথ্যনির্ভর; সেখানে বিশ্লেষণের গভীরতা, নান্দনিক পাঠ কিংবা সমালোচনামূলক অনুধ্যানের ঘাটতি স্পষ্ট।

নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প
নীরবতা ও শব্দের মাঝখানে আত্মীয়তা, ইসমত আর সন্ধ্যার গল্প

যে কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চায় আমরা এক ধরনের মিশ্র চিত্র দেখি, কোথাও সাফল্যের দীপ্তি, কোথাও অপূর্ণতার ছায়া। গবেষণার স্বল্পতা সাহিত্যকে অনেক সময় তাৎক্ষণিক সৃজনে সীমাবদ্ধ করে রাখে, দীর্ঘমেয়াদি বোধ ও দৃষ্টির প্রসার ঘটাতে পারে না। ইসমত শিল্পীর মতে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব কেবল মানসম্মত গবেষণার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলা সম্ভব হলে। নতুন গবেষকদের সাহস দেওয়া, তাদের চিন্তাকে মুক্ত পরিসর দেওয়া এবং সর্বোপরি গবেষণার প্রতি সামগ্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোই পারে সাহিত্যাঙ্গণকে নতুন গভীরতা ও পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে।

কর্মব্যস্ত দিনের ভিড়ে লেখাটির তৈরিতে একটু সময় লেগে গেলো। ইসমতের সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই ভাবনায় তার রেখাপাত ছিল, শব্দগুলো মনে মনে গুছিয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু সময়ের স্রোতে রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ সামনে এসে দাঁড়ানোয় সেই ভাবনাকে কাগজে নামাতে বিলম্ব হলো। তবু ভালো লাগছে, নতুন বছরের শুরুতেই বন্ধুর জন্য লেখাটি সম্পন্ন করতে পেরে।

এই লেখার পেছনে ইসমতের যে সহায়তা ও নিঃশর্ত আস্থা ছিল, তার জন্য রইল অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। নতুন বছরে ইসমত শিল্পীর কলমে আসুক আরও দৃঢ়তা, চিন্তার পরিসরে জন্ম নিক আরও গভীর ও প্রখর বোধ, আর জীবনের পথে নেমে আসুক প্রশান্তি ও সাফল্যের নির্ভার আলো।