নাচে জন্ম নাচে, মৃত্যু পাছে পাছে : জীবন ও মৃত্যুর নৃত্যদর্শন
- আপডেট সময় : ০৫:১১:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ৩৭৪ বার পড়া হয়েছে
বিরাজলক্ষী ঘোষ
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে
তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ॥
হাসিকান্না হীরাপান্না দোলে ভালে,
কাঁপে ছন্দে ভালোমন্দ তালে তালে,
নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে,
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ–
সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ॥
রবি কথা..
নাচে জন্ম নাচে, মৃত্যু পাছে পাছে : জীবন ও মৃত্যুর নৃত্যদর্শন
মানবজীবন এক অদ্ভুত ছন্দ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের চলাফেরা যেন এক অন্তহীন নৃত্য। এই নৃত্যে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে ব্যথা; যেমন সৃষ্টি আছে, তেমনি আছে ধ্বংস। “নাচে জন্ম নাচে, মৃত্যু পাছে পাছে” এই ছোট্ট পংক্তিটি তাই জীবনের এক গভীর দর্শনকে স্পষ্ট করে তোলে।

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে জীবননৃত্য
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শনজগতে নৃত্য কেবল শরীরের ভঙ্গিমা নয়, বরং জীবনের প্রাণপ্রকাশ। তাঁর গান “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে কিংবা নাটক তাসের দেশ-এ দেখা যায়, জীবন স্বয়ং আনন্দের জন্য।
নাচে জন্ম নাচে এর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্র-ভাবনার সেই স্বতঃস্ফূর্ততা। তিনি বলেছেন, জীবনকে কোনো বাহ্যিক উদ্দেশ্যের জন্য নয়, বরং তার নিজস্ব সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার জন্য উপভোগ করতে হবে।
তবে তিনি এ-ও মানতেন যে মৃত্যু জীবনের শেষ বিন্দু নয়। মৃত্যুতে মিলন, মরণরাতে ইত্যাদি কবিতায় তিনি মৃত্যু ও জীবনের অখণ্ড সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তাই নৃত্যের ছন্দে যেমন তীব্রতা আছে, তেমনি রয়েছে মৃত্যুর মৃদু পদশব্দও।
শিবের তাণ্ডব নৃত্যে সৃষ্টি ও লয়
ভারতীয় পুরাণে নৃত্যের সর্বোচ্চ রূপ হলো মহাদেবের তাণ্ডব। শিব যখন আনন্দতাণ্ডব করেন তখন মহাবিশ্ব সৃষ্টির আলোয় ভরে ওঠে, আর রুদ্রতাণ্ডব প্রলয়ের বার্তা আনে।
নাচে জন্ম নাচে—শিব আনন্দে মহাবিশ্বকে কম্পিত করেন, সৃষ্টির প্রতিটি কণা তাঁর ছন্দে দুলতে থাকে।
মৃত্যু পাছে পাছে—এই তাণ্ডবের প্রতিটি ঘূর্ণনে ধ্বংসও লুকিয়ে থাকে। মহাবিশ্বের ধ্বংস ও পুনর্জন্ম একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। মৃত্যুই এখানে নতুন সৃষ্টির পথপ্রদর্শক।

দার্শনিক ব্যাখ্যা
মানুষের জীবনে আনন্দ, দুঃখ, সাফল্য, ব্যর্থতা সবকিছুই এক মহা-নৃত্যের ছন্দময় প্রকাশ। কিন্তু এই নৃত্য কখনোই একা নয়—তার সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর ছায়া লেগে থাকে।
জীবন যদি হয় নৃত্যের হাসি, তবে মৃত্যু তার প্রতিধ্বনি।
জীবন ও মৃত্যু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।
মানুষের কর্তব্য হলো মৃত্যুর ভয় না পেয়ে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ছন্দময় নৃত্যে পরিণত করা।
নাচে জন্ম নাচে, মৃত্যু পাছে পাছে আমাদের শেখায় যে জীবনের আসল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে তার ক্ষণস্থায়িত্বে। মৃত্যু থাকায় জীবন আরও মূল্যবান, আর এই মৃত্যুর সঙ্গেই মানুষের জীবননৃত্য পূর্ণতা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন—
মরণরে, তুহুঁ মম শ্যাম সমান।

তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নৃত্যের আনন্দে ভরিয়ে তুলতে হবে, কারণ মৃত্যু সঙ্গী হয়েও সেই নৃত্যকে ভয়ঙ্কর নয়, বরং মহিমান্বিত করে তোলে।
সর্বে ক্ষয়ান্তা নিচয়াঃ পতনাস্তাঃ সমুচ্ছ্ৰয়াঃ।
সংযোগা বিপ্রয়োগান্তা মরণান্তং চ জীবিতম্॥
তস্মাৎ পুত্রেষু দারেষু মিত্রেষু চ ধনেষু চ।
নাতিপ্রসঙ্গঃ কর্তব্যো বিপ্রয়োগো হি তৈর্ধ্রুবম্।।
(রামায়ণ : উত্তরকাণ্ড, ৫২.১১-১২)
সংসারে যত সঞ্চিত বস্তু আছে, তার সবকিছুর পরিণাম বিনাশ, উত্থানের অন্ত পতন, সংযোগের অন্ত বিয়োগ এবং জীবনের অন্ত হল মৃত্যু। সুতরাং স্ত্রী, পুত্র, মিত্র ও ধনে বিশেষ আসক্তি রাখা উচিত নয়। কারণ সেসব থেকে বিয়োগ হওয়া নিশ্চিত।
পরিশেষে:
জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে,
বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে ॥
এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে
তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে,
গভীর কী আশায় নিবিড় পুলকে
তাহার পানে চাই দু বাহু বাড়ায়ে ॥
নীরব নিশি তব চরণ নিছায়ে
আঁধার-কেশভার দিয়েছে বিছায়ে।
আজি এ কোন্ গান নিখিল প্লাবিয়া
তোমার বীণা হতে আসিল নাবিয়া!
ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে,
গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে ॥



















